আদালতের নির্দেশ অমান্য করে কলাতলীতে সরকারি জমিতে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ

স.ম ইকবাল বাহার চৌধুরী, কক্সবাজার:

প্রকাশ: ১৯:৪০, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৯:৪১, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আদালতের নির্দেশ অমান্য করে কলাতলীতে সরকারি জমিতে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ

একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কক্সবাজার শহরের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কলাতলী মোড়ের কাছে হাজার কোটি টাকা মূল্যের একটি বাতিলকৃত সরকারি প্লটে অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। বহুতল ভবন ও কমার্শিয়াল জোন সংলগ্ন ৪.৫ একরের বেশি আয়তনের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত এই জমিতে প্রায় ২০ ফুট উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে গোপনে রাত-দিন নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। জেলা প্রশাসক কাজ বন্ধ করতে বললেও থামছেনা দখলযজ্ঞ। আর এ দখল ও স্থাপনা নির্মানের নেতৃত্বে আছে ইউসুফ আব্দুল্লাহ ও কামরুল। এই সিন্ডিকেট কয়েক কোটি টাকা নিয়ে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর পিএসকে দিয়ে জমিগুলো দখলের মিশনে নেমেছে বলে জানান একটি সূত্রে।

নির্মাণাধীন ২০ দোকান থেকে কোটি কোটি টাকা সালামির প্রস্তুতি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্মাণাধীন অন্তত ২০টি দোকান থেকে কোটি কোটি টাকা অগ্রিম বা ‘সালামি’ তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী দখলদার সিন্ডিকেট।

কলাতলী প্রধান সড়কের পাশে পুলিশ বক্স থেকে মাত্র ১০০ মিটার উত্তরে অবস্থিত বিএস খতিয়ান নং-০১-এর ৩০ নম্বর প্লটটি (দাগ নম্বর ২০০০৩) নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন। উচ্চ আদালত ওই জায়গায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের নতুন স্থাপনা না তোলার জন্য ‘স্থিতাবস্থার’ (ঝঃধঃঁং ছঁড়) আদেশ দেন। কিন্তু আদালতের এই নির্দেশকে তোয়াক্কা না করেই ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখলের পাঁয়তারা চলছে।

২০ ফুট উঁচু টিনের বেড়ার আড়ালে নির্মাণকাজ

সরেজমিনে কলাতলী মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশ ২০ ফুটের বেশি উঁচু টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। তার উপরে আদালতের স্থিতিবস্থা বজায় রাখার আদেশের সাইনবোর্ড টাংগানো আছে। বাইরে থেকে ভেতরে কী হচ্ছে তা দেখার কোনো উপায় নেই। তবে টিনের বেড়ার ভেতরের অংশ থেকে অনবরত নির্মাণকাজের শব্দ আসছে।

কৌতূহল নিয়ে ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, দেশীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা মিস্ত্রিকে দিয়ে দ্রুত গতিতে পাকা ও আধা-পাকা দোকান ঘর নির্মাণের কাজ করানো হচ্ছে। কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকেরা জানান, স্থানীয় এক রেস্তোরাঁ মালিকের অধীনে তারা কাজ করছেন, তবে মূল মালিক কে তা তারা জানেন না।

ইউসুফ আবদুল্লাহর নামে বরাদ্দ হওয়া প্লট বাতিল

স্থানীয় সূত্র ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রাসাদ প্যারাডাইসের সাবেক স্বত্বাধিকারী ইউসুফ আবদুল্লাহর নামে অতীতে বরাদ্দ হওয়া এই প্লটটি পরবর্তীকালে সরকার বাতিল করে। বর্তমানে ইউসুফ আবদুল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পাশে অবস্থিত 'বৈশাখী রেস্টুরেন্ট'-এর মালিক কামরুলের তত্ত্বাবধানে একটি চক্র এই নির্মাণকাজ পরিচালনা করছে।

অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে ও স্থানীয় প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে দোকানগুলোর নির্মাণকাজ শেষ করে চুক্তিভিত্তিক বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আগেও দোকান নির্মাণ

এলাকাবাসী জানান, একই প্লটের একাংশ দখল করে ইতিপূর্বে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে 'বৈশাখী রেস্টুরেন্ট'সহ প্রায় ২০টি দোকান গড়ে তোলা হয়েছিল, যা থেকে প্রায় কোটি টাকার সালামি ও নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে চক্রটি।

গত বছরের (২০২৫ সালের) ৮ মে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) কলাতলী ডলফিন মোড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে ‘মোহনা রেস্টুরেন্ট’সহ বেশ কিছু দোকান গুঁড়িয়ে দিলেও রহস্যজনকভাবে ওই বৈশাখী রেস্টুরেন্ট ও তৎসংলগ্ন অবৈধ অংশে কোনো হাত দেওয়া হয়নি।

বক্তব্য দিতে রাজি হননি কামরুল

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বৈশাখী রেস্টুরেন্টের মালিক কামরুলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে সংযোগ কেটে দেন। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়ে সংবাদের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি সরাসরি দেখা করার কথা বলেন, তবে নির্দিষ্ট সময়েও বক্তব্য দিতে রাজী হননি।

সরকারি জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযানের দাবি

সচেতন মহল জানান, বারবার ভুমি দস্যুরা শহরের পর্যটন জোন কলাতলীতে বাতিলকৃত প্লটগুলো দখলে নিতে মরিয়া হয় কেন? তারা বলেন প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগে ও কিছু কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এ কাজে সহযোগিতা দিয়ে থাকে। যদিও বা স্থানীয় সচেতন মহলের চাপের মুখে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে।

অতি দ্রুত সরকারী জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট জোর দাবী জানান সচেতন মহল।

কক্সবাজারের পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, আদালতের আদেশ অমান্য করে পর্যটন জোনের মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি দখলের এমন ঘটনা আইনশৃঙ্খলা ও আইনি ব্যবস্থার প্রতি চরম বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন।

অবৈধ নির্মাণ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা: এসিল্যান্ড

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মশিয়ুর রহমান বলেন, "আদালতের আদেশের সুযোগ নিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে সরকারি খাস জমি দখল করার কোনো সুযোগ নেই। যদি বাতিলকৃত সরকারি প্লটে অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণের কাজ চলে থাকে, তবে অবিলম্বে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।"

কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে: জেলা প্রশাসক

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, বাতিলকৃত প্লটে কোনো অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বেআইনি। কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, এরপর ও স্থাপনা নির্মাণ করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন