চাই সুই উ মারমা, রাঙ্গামাটি
প্রকাশ: ১৬:৩০, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে দেশের প্রথম অনগ্রিড সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ। সাত বছর আগে পাহাড়ের পরিত্যক্ত জমিতে গড়ে ওঠা ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার এ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে কেন্দ্রটিতে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, ১৯৬২ সালে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পর কাপ্তাই বাঁধের পাশে প্রায় ২২ একর জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। এর মধ্যে ১৯ একর জমিতে প্রায় ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালে নির্মাণ করা হয় ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি।
একসময় পরিত্যক্ত পড়ে থাকা ওই জমিতে এখন সারি সারি সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে। সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিয়মিত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। এতে অব্যবহৃত জমির ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প উৎস তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তুলনামূলক লাভজনক। এখানে জনবল ও পরিচালন ব্যয় কম। মূলত সৌর প্যানেল পরিষ্কার রাখা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে উৎপাদন কিছুটা কমে গেলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। পাহাড়ের অব্যবহৃত জমিতে এ ধরনের প্রকল্পের সম্প্রসারণ করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বর্তমান কেন্দ্রের সঙ্গে আরও ১ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। কেন্দ্রের ব্রিকফিল্ড এলাকায় নতুন প্রকল্পটির দরপত্র প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস কিংবা কয়লার মতো প্রচলিত জ্বালানি পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় সাশ্রয় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ রয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতেও এ ধরনের প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশের এক-দশমাংশ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে রয়েছে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির বিস্তীর্ণ এলাকা। এসব জেলার উপযুক্ত ও অব্যবহৃত জমি যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য, বনভূমি সংরক্ষণ, ভূমির প্রকৃতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার বিবেচনায় রেখে প্রকল্প নির্বাচন জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের উপযুক্ত জমির পাশাপাশি ভবনের ছাদ, কৃষিভিত্তিক সৌরব্যবস্থা ও সৌর পার্ক স্থাপনে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব।
কাপ্তাইয়ের সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারি উদ্যোগ, পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ আরও প্রশস্ত হতে পারে।