চাই সুই উ মারমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ২২:২৮, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে পর্যটন সড়কে চলমান অনির্দিষ্টকালের অবরোধ প্রত্যাহার নিয়ে সরকারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সমঝোতা হয়নি। সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে সাজেকের উজো বাজারে সরকারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক হয়। বৈঠকে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতি হলেও মূল দাবি নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। বাকি একটি বিষয়ে আগামী দু-এক দিনের মধ্যে আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তাঁর বিশ্বাস, শিগগিরই পর্যটন সড়ক খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
সোমবার সন্ধ্যায় সাজেকের পরিস্থিতি পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানান, রাত হয়ে যাওয়ায় এবং এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাকি বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সংকট সমাধানে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, সোমবার রাতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমার পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকারি প্রতিনিধি দল নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি। এ কারণে অবরোধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, এ বিষয়ে সরকারি পক্ষ তিন সপ্তাহ সময় চাইলেও আন্দোলনকারীরা তাতে সম্মত হননি। তাঁদের দাবি, সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের মধ্যে সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রয়োজনে সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমার নেতৃত্বে বৈঠকে আন্দোলনকারীদের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের উষাতন চাকমা, কমিটির জিকো চাকমা এবং সাজেক নারী সমাজের সদস্য সাধনা দেবী চাকমা।
সরকারি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া। প্রতিনিধি দলে ছিলেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী এবং দুই জেলার পুলিশ সুপার মো. মোর্তজা আলী খান ও মো. আব্দুর রকিব।
এর আগে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে বৈঠক করেন। পরে দুই জেলার সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাজেকের আন্দোলনস্থল পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন।
পাঁচ দফা দাবিতে অবরোধ
আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—গত ২২ অক্টোবর অবরোধকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি, হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে বাঘাইহাট জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর মো. সালমান সিদ্দিক ও মাচালং ক্যাম্পের কমান্ডার ক্যাপ্টেন খন্দকার মেহেদী হাসানকে শাস্তি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলি এবং ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত। এ ছাড়া দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে উজো বাজারের ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাটের ক্ষতিপূরণ, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ, উজো বাজার থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যদের প্রত্যাহার এবং সাজেক থেকে জেএসএসের সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া। আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ এবং তাঁদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি না চালানোর দাবিও রয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে স্থানীয় সামরিক প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েও কার্যকর পদক্ষেপ না পাওয়ায় গত ১১ অক্টোবর পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে সেনা কর্তৃপক্ষের অনুরোধে দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হলেও দাবি পূরণ না হওয়ায় ১৫ অক্টোবর থেকে পুনরায় অবরোধ শুরু হয়। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সাময়িক বিরতির পর ২২ অক্টোবর থেকে আবারও অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন আন্দোলনকারীরা।
সরকারি প্রতিনিধি দল আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আশাবাদ জানালেও আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, মূল দাবি পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না। ফলে সাজেকের পর্যটন সড়ক সচল হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।