বরিশালে গ্যাং কালচারের ভয়ংকর বিস্তার, পেছনে ‘বড় ভাই’ কারা?

আহমেদ বায়েজিদ, বরিশাল

প্রকাশ: ১৫:০২, ৫ অক্টোবর ২০২৬

বরিশালে গ্যাং কালচারের ভয়ংকর বিস্তার, পেছনে ‘বড় ভাই’ কারা?

মোটরসাইকেলের বহর। হাতে দেশীয় অস্ত্র। সড়কে প্রকাশ্য মহড়া। কখনো নদীর পাড়ে গিয়ে অস্ত্র হস্তান্তর, আবার কখনো প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করে হামলা। এরপর সেই দৃশ্য ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যেন অপরাধ নয়, নিজেদের ‘ক্ষমতা’ প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। বরিশাল মহানগরসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের এমন তৎপরতায় উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় এলাকাভিত্তিক অসংখ্য কিশোর ও তরুণ গ্রুপ সক্রিয়। তাদের একটি অংশ মাদক, ছিনতাই, চুরি, ইভটিজিং, মারামারি, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়—এই গ্রুপগুলোর একটি অংশ এখন আর অপরাধ আড়াল করছে না; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করে নিজেদের আধিপত্য জানান দিচ্ছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বরিশাল মহানগরসহ বিভাগের ছয় জেলায় অন্তত অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং চক্র সক্রিয় রয়েছে। সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে বলেও দাবি রয়েছে। যদিও এসব চক্রের প্রকৃত সংখ্যা ও সদস্যদের সম্পৃক্ততা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতার সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে নগরীর পলাশপুরের মাছ ব্যবসায়ী বাবু শিকদার হত্যাকাণ্ড। কালাম শিকদারের ছেলে বাবু শিকদার হামলার শিকার হয়ে নিহত হন। ঘটনার পর কাউনিয়া থানা পুলিশ হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে টোকাই মধু, শহীদ ওরফে কালা শহীদ এবং মটু সিয়ামকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে এ ঘটনায় আলোচিত ‘ডেঞ্জার বয়েজ’ চক্রের নেতা হিসেবে পরিচিত রিদওয়ান এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে কিছুদিন আগে রিদওয়ানের একটি হাত কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বেলতলার মামুন ওরফে বাবা মামুনের নামও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে পলাশপুরের ‘ফকির গ্রুপ’ নামে পরিচিত একটি কিশোর চক্রের নেতৃত্বে ফকির রাজু রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে কাউনিয়া থানায় একাধিক মামলা থাকার কথাও জানা গেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ভিডিওতে কয়েকজনকে মোটরসাইকেলে করে ধারালো অস্ত্র নিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। পরে নদীর পাড়ে গিয়ে তাদের মধ্যে অস্ত্র হস্তান্তরের দৃশ্যও রয়েছে বলে জানা গেছে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এতটা প্রকাশ্যে অস্ত্রের প্রদর্শন কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? স্থানীয়দের অভিযোগ, বেলস পার্ক ও আশপাশের সড়ক, কালিজিরা নদীর পাড় থেকে চরবাড়িয়া পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় কিশোর ও তরুণদের মোটরসাইকেল শোডাউন ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে। কখনো ১০-১২ জনের দল, কখনো আরও বড় বহর নিয়ে সড়কে ঘুরছে তারা। পথচারী কিংবা স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে একাধিক গ্রুপের নাম আলোচনায় রয়েছে। গরিয়ারপাড়, চৌমাথা, নিউ সার্কুলার রোড, বাংলাবাজার, কালুশাহ সড়ক, বটতলা, পলিটেকনিক রোড, আমিরকুটির, কেডিসি, চাঁদমারী, মতাসার, কাকাশুরা, সাধুর বটতলা, কাউনিয়া হাউজিং, জানুকিসংহ রোড, বিসিক, বাগানবাড়ি, হাওলাদার সড়ক, কাশিপুর, সাগরদি, রূপাতলী, কালীবাড়ী রোড, বিএম স্কুল, নতুন বাজার ও বিএম কলেজ এলাকায় বিভিন্ন কিশোর গ্রুপের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে রিফাদ-রিয়াদ, সাগর-শাহরুখ, জিহাদ, মুন্না-সামির, হিরা, স্টারলিংসহ বিভিন্ন গ্রুপের নাম শোনা যায়। পলাশপুরেও একাধিক গ্রুপের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত এখন পাড়া-মহল্লা ছাড়িয়ে নগরীর বিনোদনকেন্দ্রগুলোতেও পৌঁছেছে। মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, ত্রিশ গোডাউন, বেলস পার্ক ও জিলা স্কুল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কিশোর-তরুণদের আড্ডা ও দলবদ্ধ অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে। নারীদের উত্ত্যক্ত করা, মোটরসাইকেলে বিকট শব্দ সৃষ্টি, পথচারীদের বিরক্ত করা, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে মারধর করে মোবাইল ফোন কিংবা টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। শুধু ছিনতাই কিংবা অস্ত্র প্রদর্শন নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ও জুয়া বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেও গ্রুপগুলোর মধ্যে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই জুয়ার কারবার পরিচালিত হচ্ছে। জুয়ার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে মারামারি, গুরুতর আহত এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সদর রোডে প্রকাশ্যে কোপানোর ঘটনায়ও জুয়া-সংক্রান্ত বিরোধের কথা স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় থানায় অভিযোগ না থাকায় ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হচ্ছে কিশোরদের একটি অংশের এই অপরাধী বলয়ে ঢুকে পড়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথমে বন্ধুত্ব, আড্ডা কিংবা মোটরসাইকেল শোডাউনের মাধ্যমে গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে কেউ কেউ মাদক, মারামারি, ছিনতাই কিংবা অস্ত্র প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই কিশোরদের হাতে অস্ত্র আসছে কোথা থেকে? মাদক সরবরাহ করছে কারা? অপরাধের ভিডিও ধারণ ও প্রচারের পেছনে কারা উৎসাহ দিচ্ছে? আর গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে একই কর্মকাণ্ডে ফিরে আসার সুযোগই বা কীভাবে তৈরি হচ্ছে? নগরবাসীর বড় প্রশ্ন এখানেই। একটি কিশোরের পক্ষে একা অস্ত্র সংগ্রহ, মাদক কারবার কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধ পরিচালনা করা কতটা সম্ভব? স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য হলে, এসব গ্রুপের পেছনে মাদক ব্যবসায়ী, অপরাধী চক্র কিংবা প্রভাবশালী কোনো মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার পুরো সমাধান সম্ভব নয়। তাদের যারা ব্যবহার করছে, অস্ত্র বা মাদক সরবরাহ করছে কিংবা অপরাধের পর আইনি সহায়তা দিয়ে আবার মাঠে নামার সুযোগ করে দিচ্ছে—তাদের শনাক্ত করা না গেলে একই চক্র নতুন সদস্য নিয়ে আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। নগরবাসীর প্রশ্ন—আজ যে কিশোর হাতে অস্ত্র নিয়ে ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে, তাকে যদি এখনই থামানো না যায়, তাহলে আগামী দিনে এই ‘গ্যাং কালচার’ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বরিশালের রাস্তায় প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রদর্শনী—এটি কি কেবল কিছু বেপরোয়া কিশোরের দৌরাত্ম্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো অপরাধী নেটওয়ার্ক? সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজে বের করা জরুরি।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ঠেকাতে বরিশাল নগর পুলিশ এরই মধ্যে তালিকা তৈরি করে অভিযান শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ। তিনি জানান, পুলিশের প্রস্তুত করা তালিকায় থাকা কিশোরদের চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার বিকেলে দেশীয় অস্ত্রসহ এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, শুধু পুরোনো গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরেই অভিযান শেষ করা হবে না। নতুন করে কোনো এলাকায় কিশোরদের সংঘবদ্ধ হয়ে গ্রুপ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখছে পুলিশ। এ ধরনের নতুন গ্রুপের তথ্য সংগ্রহ করে তাদেরও তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। বরিশাল নগরীতে নতুন কোনো কিশোর গ্যাংকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে কঠোর অবস্থানের কথা জানান তিনি। এমনকি কোনো অপরাধী রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করেন পুলিশ কমিশনার। তার মতে, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ঢাল হিসেবে কাজ করবে না। অপরাধী যে পরিচয়ই ব্যবহার করুক না কেন, আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ কমিশনারের এমন বক্তব্যে কিশোর গ্যাং দমনে নগর পুলিশের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হলেও এখন দেখার বিষয়—তালিকাভুক্ত কিশোরদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাদের পেছনে থাকা অস্ত্র ও মাদক সরবরাহকারী এবং কথিত আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও একইভাবে অভিযান পরিচালিত হয় কি না।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন