ইমন হাওলাদার, ঢাকা কলেজ
প্রকাশ: ১৬:০৮, ৮ অক্টোবর ২০২৬
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে নিউমার্কেট থানায় অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী নাইমুল হাসান জুবায়ের। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেছেন অভিযুক্ত নেতা সাজ্জাদ হোসেন জেমিন। তিনি বলেছেন, জুবায়ের ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত এমন তথ্য জানার পর তাকে থানায় হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আনা হচ্ছিল।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নিউমার্কেট থানায় অভিযোগটি দেন নাইমুল হাসান জুবায়ের। তিনি ঢাকা কলেজ ছাত্র অধিকার পরিষদের ১ নম্বর কার্যকরী সদস্য। একই সঙ্গে তিনি ঢাকা কলেজের দর্শন বিভাগের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থী।
অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতার নাম সাজ্জাদ হোসেন জেমিন। তিনি ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক। অভিযোগে অন্য যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য আরিয়ান ও ইমরান ফকির। এছাড়া ইভান, সোহাগ, জুবায়ের জয়, এখলাস, সাদ হোসেন তামীম, স্বপনীল, সাওয়াদ গোসেন তাহসিন ও মাহফুজ।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা সবাই ছাত্রদলের কর্মী এবং সাজ্জাদ হোসেন জেমিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
থানায় দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন জেমিনের উদ্যোগে নাইমুল হাসান জুবায়ের কক্সবাজার ভ্রমণে যান। পরে ৩ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে তাকে ঘুম থেকে তুলে জেমিনের হোটেল কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জেমিনসহ কয়েকজন বহিরাগত তাকে গামছা দিয়ে মুখ ও হাত বেঁধে ফেলেন। এরপর ছুরি, কাঁচি, বেল্ট, স্ট্যাম্প ও গামছা দিয়ে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। জুবায়েরকে আটকে রেখে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এ সময় ভোর ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তার ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
জুবায়েরের অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো এবং সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে ইয়াবাসহ নেশাজাতীয় দ্রব্যের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে ভিডিও ও ছবি ধারণ করা হয়। সেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। পরে তাকে অপহরণ করে ঢাকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। কুমিল্লার নূরজাহান হোটেল থেকে তিনি পালিয়ে যান। এর আগে তার টাকা, ব্যাগ ও মোবাইল নিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কারণে ভবিষ্যতে তার ওপর পুনরায় হামলা বা ক্ষতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জুবায়ের।
ভুক্তভোগী ছাত্র অধিকার পরিষদের কর্মী নাইমুল হাসান জুবায়ের বলেন, "ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন জেমিনের অমন্ত্রণে গত ৩১ সেপ্টেম্বর রাতে আমরা কক্সবাজার ট্যুরে যাই। কিন্তু ট্রেনে ওঠার পর থেকেই উনার অনুসারী জুনিয়ররা আমার সাথে নানাভাবে মানসিকভাবে হয়রানিমূলক আচরণ করতে থাকে। কক্সবাজারে দুটি পৃথক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। হোটেলে অনৈতিক কাজ ও বিচে একজন ভাসমান নারীর সাথে তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। যার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না।”
তিনি বলেন, “এসব অনৈতিক ঘটনায় ঘটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য তারা আমাকে দায়ী করে। কিন্তু তখন আমি হোটেলে গভীর ঘুমে ছিলাম। এরপর ভোর আনুমানিক ৪টা থেকে ৫টার দিকে আমাকে ঘুম থেকে তুলে ছাত্রদল নেতা জেমিন ভাইয়ের রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। রুমে ঢুকিয়ে আমার সামনে প্লাস্টিকের স্টাম্প, বেল্ট, কাঁচি ও চাকু রাখা হয়। এরপর চতুর্দিক থেকে আমার ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন শুরু হয়। চড়-থাপ্পড়, ঘুষি ও লাথি দিয়ে আমার মাথা, মুখ ও পিঠে আঘাত করা হয়।"
জুবায়ের বলেন, "এসময় তারা আমাকে ক্রমাগত জেরা করতে থাকে এবং চাপ দিতে থাকে যেন আমি স্বীকার করি যে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব —জিয়া ভাই, ইমন ইমু, পিয়াল, মিল্লাদ, আল আমিন, শরীফ, তানভীর, শিহাব ও পারভেজের মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের প্ররোচনায় আমি তাদের (জেমিন) ক্ষতি করার পরিকল্পনা করেছি। সেসময় মিথ্যা স্বীকারোক্তি না দিলে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "ভোর থেকে শুরু করে সকাল ১০টা পর্যন্ত ধাপে ধাপে আমার ওপর নির্যাতন চলে। মারধরের তীব্রতায় আমি অন্তত তিনবার অজ্ঞান হয়ে পড়ি। দুপুরের দিকে আমাকে বাইরে খেতে নিয়ে যাওয়ার সময়ও একজন আমার প্যান্টের বেল্ট ধরে রাখে যাতে আমি পালিয়ে যেতে না পারি। পরবর্তীতে আমাকে অপহরণ করে ঢাকায় নিয়ে আসার সময় আমি কুমিল্লার নূরজাহান হোটেল থেকে পালিয়ে যাই। আমার টাকা, ব্যাগ ও মোবাইল পূর্বেই নিয়ে নেয় তারা। কক্সবাজারের সী শার্ক হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলে আমার সাথে ঘটা ভয়ঙ্কর প্রমাণ পাবেন।"
অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন জেমিন বলেন, "আমরা কেউ জানতাম না যে জুবায়ের নামের এই ছেলে ছাত্রলীগের সাথে জড়িত এবং সে ছাত্রলীগ করে। আমরা কক্সবাজার ট্যুরে যাওয়া পর দুই দিনের তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তার সাথে কথা বলে জানতে পারি সে ছাত্রলীগ এবং সে আমাদের সাথে উদ্ধত আচরণ করে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে জুবায়ের আমাদের সাথে যেহেতু কলেজ থেকে এসেছে তাই আমরা তাকে কলেজের নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তর করব।"
তিনি আরো বলেন, "সে অনুসারে আমাদের সাথে করে তাকে নিয়ে আসার সময় রাত ০৫:২০ মিনিটের সময় কুমিল্লা হাইওয়ে হোটেল নুরজাহান এ যাত্রা বিরতিকালে ওয়াস রুমে যাওয়া আসার মধ্যে আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায়, অনেক খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া না গেলে হোটেল কর্তৃপক্ষের মাইকে এনাউজমেন্ট করে আমরা ২০ মিনিট অপেক্ষা করে চলে আসি।"
তিনি আরও বলেন, "আসার পর জানতে পারি সেই জুবায়ের কলেজের কারো প্ররোচনায় আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং থানায় মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছে। আমাকে এবং আমার সংগঠনকে রাজনৈতিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার কারণে আমি এই মিথ্যা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার দাবি করছি।"
এ বিষয়ে নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব হোসেন বলেন, "ভুক্তভোগী একটা অভিযোগ দিয়েছে। যিনি অভিযোগকারী, আমরা তার সঙ্গে কথা বলেছি। দরখাস্তটা পড়েছি, ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজারে। আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেখানে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। এখানে তো কোনো সুযোগ নেই। আগে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে নিই। আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাঁকে কক্সবাজারে যোগাযোগ করতে বলব।"
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব মিল্লাদ হোসেন বলেন, “ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আমাদের কাছে এবং থানাতে অভিযোগ দিয়েছে। বর্তমানে থানা তদন্ত করতেছে। বিষয়টি যেহেতু তদন্তাধীন, তাহলে প্রকৃত ঘটনা আসলে উদ্ঘাটন করে, এটার সত্যতা যাচাই করে, তারপরে যদি এমন ঘটনা ঘটে সেক্ষেত্রে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা সেন্ট্রালকে অবগত করা হবে।”
তিনি বলেন, “ছাত্রদলে সংগঠন পরিপন্থী কোনো কাজ কেউ করলে বিরুদ্ধে তো আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। আমাদের সেন্ট্রালের অধীনস্থ। সেন্ট্রাল বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সত্যতা পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। অন্যায় প্রশ্রয় পাওয়ার কোনো সুযোগ ছাত্রদলে নেই।”
অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল কক্সবাজার হওয়ায় বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে নিউমার্কেট থানা।