কোটা আন্দোলন, কোন পথে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২২:৩২, ৩ আগস্ট ২০২৪ | আপডেট: ১৩:৩৬, ২৮ আগস্ট ২০২৫

কোটা আন্দোলন, কোন পথে বাংলাদেশ

 

 

ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশেও ষড়যন্ত্রের ফলে বহুবার  অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে দেশ।  বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেলসহ ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে তা যেমন দৃশ্যমান সত্য, তেমনি ধনী-গরিবের বৈষম্য অনেক  বৃদ্ধি পেয়েছে তাও দৃশ্যমান সত্য।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় মুক্তিযুদ্ধ পক্ষের শক্তি একাধারে ১৬ বছর ক্ষমতা থেকেও বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত করতে অনেকাংশেই ব্যর্থ। দূর্নীতি, লুটপাট, দলবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার মহান  মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আর্দশ বিরোধী। মুক্তিযুদ্ধের আর্দশের সরকার ক্ষমতায় থেকে এসব হ্রাস বা শূন্য কোঠায়  না আনতে পারায় মুক্তিযুদ্ধের আর্দশ নিয়ে   নতুন প্রজন্ম অনেকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। যার ফলশ্রুতিতে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম।  মুক্তিযুদ্ধের আর্দশের শিকড় থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে না পারায় অপুষ্ট থেকে যাচ্ছে চেতনা, তাই ক্রমশই ঝিমিয়ে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম।  

 

সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে তাজা  রক্তের বহ্নি শিখায় ব্যথিত  গোটা বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশে নিরস্ত্র ও নিরপরাধ এত মানুষের লাশ আমাদের ঘুমাতে দেয় না। 

সরকারি হিসেবে ১৫০ জন বিভিন্ন পত্রিকা খবর অনুযায়ী প্রায় দুই শতাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী, পথচারী, পুলিশ, সাংবাদিকসহ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ।  শুরু থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে যৌক্তিক দাবি আদায়ের চেষ্টায় তৎপর ছিল। সরকার ও আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ওবায়দুল কাদেরের রাজনৈতিক  অপরিপক্বতা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অসংলগ্ন বক্তব্য কে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ আন্দোলন ইতিবাচক ভূমিকা না রেখে, নেতিবাচক প্রভাবই তা সহিংসতা রূপ পায়,  তা অনেকটা স্পষ্ট। তবে এসব সহিংস কর্মকান্ডে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জড়িত নয়, রাজনৈতিক হাসিল উদ্ধারে তৃতীয় পক্ষ জড়িত। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি  আলোচনা মাধ্যমে নিষ্পত্তি না করে, তবে কালক্ষেপণ তৃতীয় পক্ষের সহিংসতা করার সুযোগ সহজ হয়ে যায়। সহজ সমাধানের অন্তরালে কি ছিল এবং শত-শত তাজা প্রাণ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় ধ্বংসলীলার  দায় রাষ্ট্র পক্ষ কিভাবে এড়িয়ে যায়? সমাধানযোগ্য বিষয়টি আলোচনার পথে না গিয়ে গুলি-নির্যাতন-নিপীড়ন কখনো  ভালো ফলাফল ভয়ে আনবে না।  কোনো মানুষ সমালোচনা ঊর্ধ্বে নয়।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতার পঙক্তি 

‘নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভাল, যুগ জনমের বন্ধু  আমার আঁধার ঘরের আঁলো৷' একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের  কল্যাণে সরকারের সমালোচনা করা প্রতিটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার । সেইক্ষেত্রে সরকার দলের নেতা-কর্মীরা   কতটা সহনশীলতা পরিচয় রাখে, যা পরবর্তী সমালোচকদের জন্য উন্মুক্ত।

 

দলের দুর্দিনে  আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আজকের দিনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা হাড়েহাড়ে  টের পাচ্ছে প্রকৃত আওয়ামী প্রেমি নেতা-কর্মীরা । তিনি থাকলে হয়তো প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে  রাজনৈতিক ভাবে তা সমাধানের পথে নিয়ে যেতেন। ২০১৮ সালের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী বড্ড একা।  একা পথে হাঁটছেন তিনি। তার পাশে থেকেও নেই আমু-তোফায়েল-মেনন-ইনু-মতিয়া- দিলিপ এর মত দেশ প্রেমিক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবানরা। রাজনীতির পিচ্ছিল-কণ্টক-দূর্গম-বন্ধুর পথে একা হাটা মহা বিপদজনক। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত কতটা জরুরি, তা আরেকবার প্রমাণ করলো এ আন্দোলন। শতভাগ নিশ্চিত বলা যায়, আন্দোলন ফসল আওয়ামীলেগের ঘরে আসত। জুলাই মাসের ১৫ তারিখের আগে আলোচনা টেবিলে সঠিক  সিদ্ধান্ত নিতে পারলে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীকে শুধু ধন্যবাদই নয়, হয়তো মাদার অব স্টুডেন্টস হিসেবে ভূষিত করতেন।

 

কথাই শুধু আর্দশ নয়, চর্চায় পরিণত করাই আসল কথা।

 

নিত্যপন্যের বাজার লাগামহীন ঘোড়ার মত লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার কারণে নিম্ন মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠে পড়ায় ক্রমেই তাদের জীবন-যাপন অত্যন্ত কষ্ট সাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

এছাড়াও অসৎ রাজনীতিবীদ-অসৎ আমলা-অসৎ ব্যবসায়ীদের ত্রিচক্র সিন্ডিকেটের দূর্নীতির ফলে সাধারণ মানুষের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ  আন্দোলনকে ক্রমশ বেগবান করেছে। প্রচলিত কথা আছে শুকনো কথায় চিড়া ভিজে না। 

দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পবিত্র সংবিধানের ২য় ভাগে অষ্টম অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূল নীতির কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। সেই চার মূল নীতির অন্যতম নীতি সমাজতন্ত্র। তা দেশ স্বাধীনের ৫৩ বছরে কতখানি কার্যকর হয়েছে? আক্ষরিক অর্থে অর্থনীতির সুষম বণ্টনে সমাজতন্ত্রের নীতি  সংবিধানের পাতার বাইরে আসেনি আজও। 

 

সংঘর্ষ ও রক্তাত বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে আসতে প্রধানমন্ত্রী তার আর্দশিক ১৪ দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে কোটা আন্দোলনের সমন্বয়কারীদের  সাথে দ্রুত আলোচনা মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা উত্তম পন্থা। তবে এত তাজা  রক্ত ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে সমন্বয়কারীরা আলোচনার পথে হাঁটবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন?

 

লেখক

শারফুদ্দীন সোহেল

সাংগঠনিক সম্পাদক,

জাতীয় যুব জোট(জাসদ),

কেন্দ্রীয় সংসদ।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন