সাদ্দাম হোসেন
প্রকাশ: ১৯:৩২, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইসিডিডিআর,বি-এর বর্তমান সেবা, ডায়াগনস্টিক কার্যক্রম, ল্যাবরেটরির মাননিয়ন্ত্রণ, আইএসও অ্যাক্রেডিটেশন, রোগীদের জন্য চালু থাকা সেবা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেছেন আইসিডিডিআর,বি-এর হেড অফ কমিউনিকেশনস, এ কে এম তারিফুল ইসলাম খান।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসা ও ডায়াগনস্টিক কার্যক্রমের পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক স্বাস্থ্যসমাধান তৈরিই আইসিডিডিআর,বি-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান সময়ে রোগীদের জন্য কোন কোন সেবা চালু রয়েছে, এসব সেবার মান কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ল্যাবরেটরি সেবা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে-এসব বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য দেন তিনি।
ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে রোগের চিকিৎসা ও গবেষণার পাশাপাশি স্বল্প ব্যয়ে কার্যকর স্বাস্থ্যসমাধান তৈরিতে কাজ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত 'কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরী' বা সিআরএল থেকে। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ-আইসিডিডিআর,বি-তে রূপ নেয়। পরের বছর ১৯৭৯ সালে জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি বৈঠকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও সুসংহত হয়।
ডায়রিয়া ও কলেরা নিয়ে গবেষণাই ছিল প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক মূল কাজ। ১৯৬৮ সালে আইসিডিডিআর,বি-এর পূর্বসূরি সিআরএল-এ ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএস-এর সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতার চিকিৎসায় ওআরএস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আইসিডিডিআর,বি-এর প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮২ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ওআরএসের মাধ্যমে ৫ কোটির বেশি শিশুর জীবন রক্ষা পাওয়ার হিসাব পাওয়া যায়; ২০১৯ পর্যন্ত এই সংখ্যা ৭ কোটির বেশি হতে পারে বলে গবেষণাভিত্তিক পরিসংখ্যান উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কলেরা গবেষণাতেও রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ১৯৬০-এর দশক থেকেই বাংলাদেশে কলেরার মহামারি, রোগের বিস্তার, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ নিয়ে গবেষণা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন সময়ে কলেরা ভ্যাকসিনের একাধিক মাঠপর্যায়ের পরীক্ষাতেও আইসিডিডিআর,বি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কলেরা রোগীর চিকিৎসায় দ্রুত পানিশূন্যতা পূরণ এবং উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নেও প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও-এর সঙ্গেও আইসিডিডিআর,বি-এর দীর্ঘদিনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে। ডব্লিউএইচও-এর নথিতে আইসিডিডিআর,বি-কে ডায়রিয়াজনিত রোগ বিষয়ে আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ডব্লিউএইচও কোলাবোরেটিং সেন্টার হিসেবে মনোনীত করার কথাও নথিভুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেও আইসিডিডিআর,বি-এর বিশেষজ্ঞরা ডব্লিউএইচও -এর সঙ্গে কাজ করেছেন।
চিকিৎসা ও গবেষণার পাশাপাশি বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য ডায়াগনস্টিক সেবাও আইসিডিডিআর,বি-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় মহাখালী, ধানমন্ডি, উত্তরা, মিরপুর ও মতিঝিল-এই পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ সেন্টার এবং নিকেতন, বারিধারা ও গুলশানে তিনটি বুথসহ মোট আটটি নিয়মিত স্যাম্পল কালেকশন লোকেশন রয়েছে।
মহাখালী কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত স্যাম্পল সংগ্রহ এবং রাত ১০টা পর্যন্ত রিপোর্ট ডেলিভারির ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য কেন্দ্রেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহ ও রিপোর্ট সরবরাহ করা হয়।
ডায়াগনস্টিক সেবায় রয়েছে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজি, ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি, মলিকিউলার ডায়াগনস্টিকস, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিসহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা। ফলে সংক্রামক রোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জটিল রোগ শনাক্তকরণেও এসব পরীক্ষা ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে আইসিডিডিআর,বি-এর ডায়াগনস্টিক সেবার বড় আলোচনার জায়গা হলো মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন।
প্রতিষ্ঠানটির ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি ২০১১ সাল থেকে 'আইএসও ১৫১৮৯' এবং 'আইএসও ১৫১৯০' অ্যাক্রেডিটেশন ধরে রেখেছে। আইসিডিডিআর,বি-এর ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের ল্যাবরেটরিই বাংলাদেশে প্রথম অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরি হিসেবে এই স্বীকৃতি অর্জন করে। পাশাপাশি ১৯৯৩ সাল থেকে কলেজ অফ আমেরিকান প্যাথলজিষ্ট বা সিএপি-এর এক্সটার্নাল কোয়ালিট এসিউরেন্স স্কীম বা ইকিউএএস-এ অংশ নিচ্ছে এবং নিয়মিত ভালো ফলাফলের জন্য সিএপি-এর প্রশংসাও পেয়েছে।
'আইএসও ১৫১৮৯' মূলত মেডিকেল ল্যাবরেটরির গুণগত মান ও সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর 'আইএসও ১৫১৯০' মেডিকেল ল্যাবরেটরির নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে পরীক্ষার ফলের নির্ভুলতা, মান নিয়ন্ত্রণ, রোগীর নিরাপত্তা এবং ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে আইসিডিডিআর,বি-এর হাসপাতাল সেবাতেও ডায়রিয়া ও সংক্রামক রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা, স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, টিকাদান, স্তন্যদান সহায়তা, গুরুতর নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের চিকিৎসা এবং শিশুদের তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ডায়রিয়ার মৌসুমে তাদের ঢাকা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার রোগী পর্যন্ত চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
অর্থাৎ, ছয় দশকের গবেষণা, ডায়রিয়া ও কলেরা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা, ওআরএসের সফল প্রয়োগ, রোগী চিকিৎসা, গবেষণা এবং আইএসও ও আন্তর্জাতিক মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমন্বয়ে আইসিডিডিআর,বি এখন শুধু একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয়; চিকিৎসা, রোগ নির্ণয় ও জনস্বাস্থ্য গবেষণার একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করছে।