আহমেদ বায়েজিদ,বরিশাল
প্রকাশ: ১৪:৫০, ১ অক্টোবর ২০২৬
গত মঙ্গলবার বিসিএস ২৫ ব্যাচের এই কর্মকর্তাকে পটুয়াখালী থেকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য এ বদলিকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং জেলা প্রশাসকের বদলির বিষয়টি সামনে আসায় নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মচারীর দাবি, রাজস্ব শাখার ১০টি অফিস সহায়ক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জহিরুল ইসলাম নামে এক প্রার্থীকে চাকরি দিতে প্রভাবশালী মহল থেকে তদবির করা হয়েছিল। তাদের দাবি, তদবিরের বিষয়টি জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও জানা ছিল।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় ওই ১০টি পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা। পরীক্ষায় জহিরুল ইসলাম সর্বোচ্চ নম্বর পান। কিন্তু পরদিন মৌখিক পরীক্ষায় গিয়ে তিনি বোর্ডের বিভিন্ন প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। এতে পরীক্ষকরা সন্দেহ করেন, লিখিত পরীক্ষায় অন্য কেউ অংশ নিয়েছিলেন কি না।
পরে লিখিত পরীক্ষার খাতায় থাকা জহিরুলের হাতের লেখার সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষার সময় নেওয়া হাতের লেখা মিলিয়ে দেখা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দুই হাতের লেখায় অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জহিরুল স্বীকার করেন, তার পরিবর্তে সাখাওয়াত নামে অন্য একজন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।
এরপর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। জহিরুলকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
জেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, পছন্দের প্রার্থীকে চাকরি দেওয়ার তদবির উপেক্ষা করে প্রক্সি পরীক্ষার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ায় জেলা প্রশাসকের ওপর ক্ষোভ তৈরি হয়। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা হয়। এর পরই ঘটে জেলা প্রশাসকের বদলি।
তবে পিয়ন পদে নিয়োগের জন্য তদবির করার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের আচরণগত বিভিন্ন বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। কোনো প্রার্থীকে পিয়ন পদে চাকরি দেওয়ার জন্য তিনি তদবির করেননি।
নুরুল হক নুরের দাবি, তিনি পটুয়াখালী সফরে গেলে জেলা প্রশাসক তার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন না। এমনকি সরকারি সফরের সময় একটি সেমিনারে যোগ দেওয়ার কথা বলেও জেলা প্রশাসক কুয়াকাটায় চলে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব আচরণের বিষয়েই তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
অন্যদিকে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, জেলা প্রশাসকের পদোন্নতি হয়েছে এবং বদলিটি প্রশাসনের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। এর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
পটুয়াখালীর সাবেক জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রক্সি পরীক্ষার মতো প্রতারণায় অভিযুক্ত কোনো প্রার্থীর পক্ষে জনপ্রতিনিধির চাকরির সুপারিশ করা অনৈতিক। আর ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে কোনো কর্মকর্তাকে যদি শাস্তিমূলকভাবে বদলি করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত হবে।
সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন
পিয়ন পদে নিয়োগের মতো একটি সাধারণ সরকারি পদে যদি প্রক্সি পরীক্ষার অভিযোগ ওঠে এবং একই ঘটনায় কোনো প্রার্থীর পক্ষে রাজনৈতিক তদবিরের অভিযোগ সামনে আসে, এরপর ওই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কর্মকর্তার বদলি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়—তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক নিয়োগে প্রভাবমুক্ততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এমন অভিযোগের সামঞ্জস্য কতটা—সেটিও এখন আলোচনার বিষয়। অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সরকারের প্রশাসনিক ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বদলিকে নিয়মিত প্রক্রিয়া বলা হয়েছে এবং প্রতিমন্ত্রীও তদবিরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে প্রক্সি পরীক্ষার ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসকের বদলির মধ্যে আদৌ কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সেটি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়ার অভিযোগ, তদবিরের অভিযোগ এবং জেলা প্রশাসকের বদলি—এই তিনটি ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্পষ্ট হলে পুরো বিষয়টির প্রকৃত চিত্রও সামনে আসতে পারে।