তিস্তায় বাড়ছে পানি, ভাঙন ও প্লাবনের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০০:২৪, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিস্তায় বাড়ছে পানি, ভাঙন ও প্লাবনের শঙ্কা

ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের প্রভাবে তিস্তা নদীতে পানির উচ্চতা বাড়তে শুরু করেছে। পানি এখনও বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে ভাঙন নিয়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকি এড়াতে অনেকে ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আগেই নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন অনেকেই।

এদিকে পানির চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের সবগুলো জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। তবে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা ও বন্যার তীব্রতা বিবেচনায় জলকপাটগুলো সবচেয়ে বেশি সময় খোলা রাখা হয়।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে নীলফামারীর ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা নির্ধারিত রয়েছে ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। তবে সন্ধ্যায় সেখানে পানির উচ্চতা পাওয়া যায় ৫১ দশমিক ৮১ মিটার।

এর আগে একই দিন সকাল ৯টায় ওই পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের মিডিয়া সেল।

পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নীলফামারীর ডিমলা ও লালমনিরহাটের নদীসংলগ্ন চরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

উজানের পানির প্রভাবে রংপুরের নিম্নাঞ্চলেও একই নদীর পানি বাড়ছে। গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর সেতু পয়েন্টে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলার কাউনিয়ায় তিস্তা সেতু পয়েন্টে রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে পানি বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। সকাল ৯টায় সেখানে পানির প্রবাহ ছিল বিপৎসীমার ৫৭ সেন্টিমিটার নিচে। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ২৯ দশমিক ৩১ মিটার নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিস্তার পানি বাড়তে থাকায় গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রশাসন দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি প্রয়োজন হলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গঙ্গাচড়ার স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আসাদুজ্জামান বলেন, উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জয়রাম ওঝা মৌজায় একসময় প্রায় ৫০০ মানুষের বসতি ছিল। বর্তমানে সেখানে নদীর দিকে তাকালেই মানুষের চোখে অনিশ্চয়তার চিত্র ভেসে ওঠে। তিস্তার ভাঙনে একের পর এক বাড়ি বিলীন হওয়ার অবস্থায় রয়েছে। আজ যে উঠানে মানুষের সংসার, আগামীকাল সেখানে হয়তো বইবে নদীর স্রোত। নতুন করে নদীর পানি বাড়তে শুরু করায় অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু সেই নিরাপদ জায়গাটিও কতদিন নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।

প্রতিদিন ক্যামেরার লেন্সে নতুন নতুন ঘটনার ছবি তুলে ধরতে ছুটে চলা এই সংবাদকর্মীর ভাষ্য, নদীতীরের এসব মানুষের কাছে ঘর মানে শুধু টিনের ছাউনি কিংবা কাঠের খাট নয়। তাদের কাছে ঘর মানে স্মৃতি, শৈশব, সন্তানের বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। নদী যখন সেই আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিতে আসে, তখন মানুষ শুধু একটি বাড়ি হারায় না, হারায় জীবনের একটি অধ্যায়। তিস্তা তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন দেখার সাহসটুকু কেড়ে নিতে পারেনি।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বৃষ্টিপাত, নদ-নদীর পরিস্থিতি এবং পূর্বাভাস সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, উত্তর আন্দামান সাগর ও এর আশপাশের এলাকায় একটি লঘুচাপ তৈরি হয়েছে। এটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আরও ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে আগামী তিন দিন দেশের অভ্যন্তর এবং সংলগ্ন উজান এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, রংপুর অঞ্চলে ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি বর্তমানে সমতলে স্থিতিশীল রয়েছে। আগামী এক দিন তিস্তার পানি বাড়তে পারে। এরপর পরবর্তী দুই দিনে পানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ধরলা ও দুধকুমারের পানি আগামী তিন দিন বাড়তে পারে।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক জানান, উজানে ভারী বৃষ্টিপাত এবং ঢলের কারণেই তিস্তার পানি বাড়ছে। উজান থেকে পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করতে পারে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান জানান, রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় রংপুরে ১১ দশমিক শূন্য মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন