মাদ্রাসায় অনুপস্থিত থেকেও শিক্ষিকার হাজিরায় উপস্থিত, তোলেন বেতনও!

মুহাম্মাদ এমাদুল ইসলাম, পটুয়াখালী

প্রকাশ: ১২:১৮, ৬ অক্টোবর ২০২৬

মাদ্রাসায় অনুপস্থিত থেকেও শিক্ষিকার হাজিরায় উপস্থিত, তোলেন বেতনও!

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। অথচ শিক্ষক থাকার পরও যদি কেউ নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে না থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি প্রশ্ন ওঠে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়েও। এমনই অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়া নেছারিয়া ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায়।

অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার বাংলা বিষয়ের এক সহকারী শিক্ষিকা নিয়মিত ক্লাস করেন না এবং কর্মস্থলেও উপস্থিত থাকেন না। অথচ তার হাজিরা খাতায় নিয়মিত উপস্থিতি দেখানো হয় এবং সেই অনুযায়ী তিনি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। আরও অভিযোগ, ওই শিক্ষিকার বেতনের টাকা দিয়ে একটি নূরানী মাদ্রাসা পরিচালনা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, বাংলা বিষয়ের সহকারী শিক্ষিকা সুমাইয়া খানম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগদান করেন। এরপর তিনি নিয়মিত ক্লাস করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থীর দাবি, যোগদানের পর তাকে মাত্র দুই-তিন দিন মাদ্রাসায় দেখা গেছে। এরপর নিয়মিত তাকে মাদ্রাসায় দেখা যায়নি। এমনকি তিনি তাদের কোনো ক্লাসও নেননি বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

অভিযোগ রয়েছে, কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত না থাকলেও তার হাজিরা খাতায় নিয়মিত উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। সেই হাজিরার ভিত্তিতে বেতন-ভাতাও উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ অলিউল্লাহ খানের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, সুমাইয়া খানম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যোগদানের পর প্রায় চার মাস ক্লাস করেছেন। এরপর তিনি মাতৃত্বকালীন ছয় মাসের ছুটি নেন। পরে কর্মস্থলে যোগ দিলেও বর্তমানে অসুস্থতার কারণে ছুটিতে রয়েছেন।

অধ্যক্ষের কাছে ওই ছুটির আবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য দেখতে চাইলে তিনি প্রথমে আবেদনটি মাদ্রাসায় থাকার কথা জানান। পরে তা দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে আবেদনটি কোথায় রাখা হয়েছে, তা তিনি জানেন না বলে জানান।

অন্যদিকে, শিক্ষিকা সুমাইয়া খানমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অসুস্থ হয়ে তিনি মাদ্রাসা থেকে চলে এসেছেন এবং এ বিষয়ে মেডিকেল রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। তবে তিনি ছুটি নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে বলেন, আমি ছুটি নিয়ে আসিনি।

শিক্ষিকার এ বক্তব্যের সঙ্গে অধ্যক্ষের বক্তব্যের অসঙ্গতি রয়েছে। ফলে তিনি ছুটি না নিয়েই কীভাবে হাজিরা খাতায় নিয়মিত উপস্থিতি দেখিয়েছেন এবং বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে?

এ বিষয়ে অধ্যক্ষ অলিউল্লাহ খান আরও বলেন, সুমাইয়া খানমের বেতনের টাকা দিয়ে একটি নূরানী মাদ্রাসা পরিচালনা করা হয়। বিষয়টি মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে একজন শিক্ষিকার বেতনের টাকা দিয়ে নূরানী মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন দেওয়া ঠিক হয়নি বলেও স্বীকার করেন অধ্যক্ষ।

তবে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক সুমাইয়া খানমের বেতনের টাকা দিয়ে নূরানী মাদ্রাসা পরিচালনার বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করেন।

অভিভাবক মো. বাচ্চু গাজী, আতিক গাজী ও আলাউদ্দিন গাজী বলেন, সুমাইয়া খানমকে তারা মাদ্রাসায় নিয়মিত দেখেননি। স্থানীয় অনেকেই তাকে ভালোভাবে চেনেন না। তার বেতনের টাকা দিয়ে নূরানী মাদ্রাসা পরিচালনা করা হয় বলেও তারা শুনেছেন।

অভিভাবকরা বলেন, শিক্ষক সংকটের সময়ে একজন শিক্ষক কর্মরত থাকার পরও যদি নিয়মিত ক্লাস না নেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য এটি আরও হতাশাজনক। তারা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশের দাবি জানান।

রাঙ্গাবালী উপজেলা শিক্ষা একাডেমিক সুপারভাইজার অনাদী কুমার বাহাদুর বলেন, বিষয়টি আপনার কাছ থেকে জানলাম। মাদ্রাসার প্রধানের সঙ্গে কথা বলব। স্থানীয়দের কাছ থেকেও তথ্য নিয়ে সত্যতা যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, বিষয়টি আপনার কাছ থেকে অবহিত হলাম। প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষিকার হাজিরা খাতা, ছুটির আবেদন, বেতন-ভাতা উত্তোলনের নথি এবং ক্লাস নেওয়ার তথ্য যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করা হোক। পাশাপাশি একজন শিক্ষিকার বেতনের অর্থ দিয়ে নূরানী মাদ্রাসা পরিচালনার অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন তারা।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন