মোঃ জানে আলম, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ১৯:৩৩, ৬ অক্টোবর ২০২৬
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলন করে আসছে। দিনের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও কোথাও কোথাও বালু উত্তোলন ও পরিবহনের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন নদীর তীরবর্তী মাটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বসতবাড়ির কাছ থেকে বালু উত্তোলন
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর তীর ও জনবসতির কাছাকাছি এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করায় অনেক জায়গায় তীরের মাটি সরে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বাড়লে এসব স্থানে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, বসতবাড়ির কাছাকাছি থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় নদীভাঙনে ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, বৈধভাবে নির্ধারিত বালুমহাল থেকে নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন হলে সরকার রাজস্ব পেত এবং স্থানীয়ভাবেও এর সুফল পাওয়া যেত। কিন্তু অনুমোদনহীনভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি নদী, পরিবেশ ও জনবসতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
কারা জড়িত, প্রশ্ন স্থানীয়দের
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেকেই প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না। বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজার ও পরিবহন ব্যবস্থার কারণে নদী ও তীরবর্তী এলাকার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন—সরকারি অনুমোদন ছাড়া যদি নিয়মিতভাবে বালু উত্তোলন হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন ধরে সংশ্লিষ্টরা কীভাবে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে? বালু উত্তোলনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর তীর, ঝুঁকিতে পড়ছে বসতবাড়ি এবং সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। অথচ এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের।
‘বসতবাড়ি একসময় বিলীন হয়ে যাবে’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সুনামগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক দুলাল মিয়া বলেন, ‘এভাবে বালু লুট করলে আমাদের বসতবাড়ি একসময় বিলীন হয়ে যাবে। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, জরুরি ভিত্তিতে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুণ-যুবক ও সচেতন নাগরিকদের সবাইকে এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।’
তিনি বলেন, নদী ও পরিবেশ রক্ষায় শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে হবে না; স্থানীয় জনগণকেও এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে।
অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা: ইউএনও
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সকিনা আক্তার বলেন, সরকারি অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলন আইনত দণ্ডনীয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় ইউপি সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে সেখানে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। বালু উত্তোলনের সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ইউএনও আরও বলেন, মসজিদের ইমাম, সমাজসেবক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসতে হবে।
অভিযানে নামছে টাস্কফোর্স
এদিকে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধ বালু উত্তোলন ও লুটপাট বন্ধে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বসতবাড়ি ও জনবসতির কাছাকাছি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ করে নদীর তীর সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
নদী ও পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব নিশ্চিত করতে বৈধ বালুমহালগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি এবং অবৈধ উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।