আহমেদ বায়েজিদ, বরিশাল
প্রকাশ: ১৭:৩৪, ১২ অক্টোবর ২০২৬
পৃথিবীর আলো দেখেছে মাত্র তিন মাস আগে। মায়ের বুকের উষ্ণতা আর আদরেই যার বেড়ে ওঠার কথা, সেই শিশুটিকে রেখে চিরবিদায় নিলেন মা ঐশী আক্তার (২৫)। যে বয়সে একটি সংসারে স্বপ্ন বোনার কথা, যে সময়ে সন্তানকে ঘিরে আনন্দে ভরে ওঠার কথা একটি পরিবারে, সেই সময়েই থেমে গেল তাঁর জীবনের পথচলা। অভিযোগ উঠেছে, দাম্পত্য কলহের জেরে স্বামীর মারধরের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন তিনি।
বরিশালের বাবুগঞ্জে স্ত্রী ঐশী আক্তারকে হত্যার অভিযোগে স্বামী সোহেল খানকে (২৮) আটক করেছে পুলিশ। সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঐশীর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবরে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত ঐশী উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের বাহেরচর সাধুকাঠী গ্রামের শাহে আলমের মেয়ে। তাঁর স্বামী সোহেল খান কেদারপুর ইউনিয়নের ভূতেরদিয়া গ্রামের কাদের খানের ছেলে। পেশায় তিনি একজন রাজমিস্ত্রি। তাঁদের ঘরে রয়েছে মাত্র তিন মাস বয়সী একটি সন্তান—যে হয়তো এখনো বুঝতে শেখেনি, মায়ের অনুপস্থিতি কাকে বলে, কিংবা কেন আর আগের মতো মায়ের বুকের কাছে ঘুমাতে পারবে না।
দাম্পত্য কলহের জেরে রড দিয়ে আঘাতের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার চার দিন আগে দাম্পত্য কলহের জেরে ঐশীর মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করার অভিযোগ ওঠে সোহেল খানের বিরুদ্ধে। এতে তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সোমবার সকালে তাঁকে বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
একটি পারিবারিক বিরোধ কীভাবে এমন মর্মান্তিক পরিণতির দিকে গড়াল, তা নিয়ে এলাকায় আলোচনা চলছে। তবে ঠিক কী পরিস্থিতিতে এই ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মৃত্যু, শরীরে গুরুতর জখমের চিহ্ন
বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ কে মনিরুল ইসলাম জানান, মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে ঐশীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানেও গুরুতর জখমের চিহ্ন ছিল।
চিকিৎসকের এই বক্তব্য ঘটনাটির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। তবে আঘাতের সুনির্দিষ্ট কারণ ও ঘটনার পুরো বিবরণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
মায়ের অপেক্ষায় থাকবে যে শিশুটি
ঐশীর মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে মর্মান্তিক বাস্তবতা হলো, তাঁর তিন মাস বয়সী সন্তানটি এখন মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত। যে শিশুর মায়ের কোলে বেড়ে ওঠার কথা, তার জীবনের শুরুতেই তৈরি হলো এক অপূরণীয় শূন্যতা।
শিশুটি বড় হতে হতে হয়তো একদিন জানতে চাইবে, তার মা কোথায়। কে তাকে ঘুম পাড়াতেন, কে বুকে জড়িয়ে আদর করতেন, কে তার কান্না শুনে ছুটে আসতেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাকে হয়তো বারবার ফিরে যেতে হবে মায়ের স্মৃতির কাছে।
একজন নারীর মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, স্বজনদের ভালোবাসা এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতের অসংখ্য মুহূর্ত। ঐশীর মৃত্যুও তাঁর পরিবারের জন্য রেখে গেল এমনই এক গভীর ক্ষত।
মামলা দায়েরের প্রস্তুতি, তদন্তে পুলিশ
বাবুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান হাওলাদার জানান, খবর পেয়ে পুলিশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সোহেল খানকে আটক করেছে। নিহতের চোখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে দাম্পত্য কলহের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
ঐশীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি এবং অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্বজন ও স্থানীয়দের। একই সঙ্গে তিন মাসের শিশুটির ভবিষ্যৎ ও দেখভালের বিষয়টিও এখন পরিবারের জন্য বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি জীবন হারিয়ে গেছে, একটি পরিবার শোকের সাগরে ডুবেছে, আর পৃথিবীকে ঠিকমতো চিনে ওঠার আগেই মায়ের সান্নিধ্য হারিয়েছে একটি শিশু। ঐশীর মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শিশুটির নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার বিষয়টিও যেন উপেক্ষিত না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে মানবিক প্রত্যাশা।