দরকষাকষি করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ভূমি কর্মকর্তা ও সহকারীর বিরুদ্ধে

ভোলা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২১:৪০, ১২ অক্টোবর ২০২৬

দরকষাকষি করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ভূমি কর্মকর্তা ও সহকারীর বিরুদ্ধে

ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার সাচড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে অবৈধভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা বজলুর রহমান ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া মো. রাকিবের বিরুদ্ধে। সরকারি ফি ছাড়াই খতিয়ানের তথ্য সরবরাহের কথা বলে টাকা দাবি, দরকষাকষি এবং টাকা দেওয়ার পরও সব খতিয়ান না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রত্যাশী সবুজ মুসলমান। এ ছাড়া অফিসে কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা এবং জমির খাজনা, নামজারি ও খতিয়ানসংক্রান্ত সেবায় অতিরিক্ত টাকা আদায় ও হয়রানির অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগকারী সবুজ মুসলমান জানান, গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সাচড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দাগ নম্বর দিয়ে এসএ খতিয়ান খুঁজতে যান তিনি। এ সময় অফিসের অফিস সহায়ক হিসেবে পরিচয় দেওয়া মো. রাকিব তাঁকে জানান, খতিয়ান খুঁজে বের করতে কয়েক দিন সময় লাগবে এবং কাজটি বেশ ঝামেলার। একপর্যায়ে কিছু খরচ দিলে খতিয়ান খুঁজে দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পরে সার্চিং ফি হিসেবে রাকিবকে ৩০০ টাকা দেন সবুজ। এরপর ১৮টি খতিয়ানের তথ্য পাওয়া যায়।

সবুজ জানান, খতিয়ানগুলো সরবরাহ করা সম্ভব কি না জানতে চাইলে দেওয়া যাবে বলে জানান রাকিব এবং তাঁকে রোববার অফিসে আসতে বলেন। কথা অনুযায়ী রোববার অফিসে গেলে ইউনিয়ন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা বজলুর রহমান তাঁকে জানান, এসব খতিয়ান দেওয়ার নিয়ম তাঁদের নেই। তবে প্রতিটি খতিয়ানের জন্য ২০০ টাকা করে মোট ১ হাজার ৮০০ টাকা দিলে সেগুলো দেওয়া যাবে বলে জানান তিনি। এ নিয়ে দরকষাকষির একপর্যায়ে তিনি ১ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করেন।

অভিযোগকারী আরও জানান, পরে ১ হাজার টাকা দিলে অফিস সহায়ক রাকিব খতিয়ানের নথির ছবি তুলে একটি কম্পিউটারের দোকানিকে পাঠান। সেখান থেকে প্রিন্ট করে আনতে বলা হয়। পরে কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে আরও ১০০ টাকা দিয়ে ১৮টির মধ্যে ১৬টি খতিয়ান প্রিন্ট করাতে পারেন তিনি। বাকি দুটি খতিয়ান দেওয়া হয়নি।

বাকি দুটি খতিয়ান আনতে পুনরায় অফিসে গেলে তাঁকে পরদিন সোমবার আসতে বলা হয়। সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পাননি বলে অভিযোগ করেন সবুজ। তাঁর দাবি, ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা টাকা নিলেও কোনো রসিদ দেননি।

সবুজ মুসলমানের অভিযোগ, শুধু তিনি নন, তাঁর মতো আরও অনেক সেবাপ্রত্যাশী টাকা দিয়ে সেবা নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে খাজনা, খতিয়ান ও নামজারির নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে ওই অফিসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১০টার পর সাচড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা বজলুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে, অভিযোগসংশ্লিষ্ট একটি ভিডিওতে বজলুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, “এটা দেওয়ার কোনো এখতিয়ার আমাদের নাই। এটা রেকর্ড রুম থেকে সহিমোহর আনতে হবে। আমরা আপনাদের সহযোগিতার জন্য মাঝে মধ্যে দিয়া থাকি।” একই ভিডিওতে তাঁকে ১ হাজার ৮০০ টাকা দেওয়ার কথা বলতে এবং পরে ১ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করতে শোনা যায়।

ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া মো. রাকিব জানান, তিনি স্থায়ী কোনো পদে চাকরি করেন না। ইউনিয়ন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা বজলুর রহমান তাঁকে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দিয়ে অফিসের কাজ করান।

রাকিব বলেন, “কাজের ক্ষেত্রে অনেকে খুশি হয়ে আমাকে যা দেয়, তাই রাখি। কারও কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো টাকা রাখি না।”

অভিযোগকারী সবুজ মুসলমানের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি ৫০০ টাকা চেয়েছি। তিনি খুশি হয়ে ৩০০ টাকা দিয়েছেন। এটা কোনো সরকারি ফি না।”

রাকিব আরও জানান, সোমবার পর্যন্ত বজলুর রহমান অফিসে আসেননি।

এদিকে, জমির খাজনা পরিশোধ, নামজারি ও অন্যান্য ভূমিসেবা নিতে গিয়ে সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা আদায়, হয়রানি এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত অফিসে না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সেবাপ্রত্যাশীরা।

শাহাজল খান নামে এক সেবাপ্রত্যাশী জানান, জমির দাখিলার জন্য আবেদন করার পর পাঁচ দিন অফিসে গিয়েও দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে পাননি। পরে তিনি আর কাজটি সম্পন্ন করতে পারেননি।

মোস্তাফিজুর রহমান নামে আরেক সেবাপ্রত্যাশী জানান, বিআরএস খতিয়ান এসেছে কি না, তা জানতে বেশ কয়েকবার ভূমি অফিসে গিয়েও কোনো সমাধান পাননি। পরে জেলা রেকর্ড অফিসে গিয়ে তাঁকে সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনোরঞ্জন বর্মন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রিফাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁরা উভয়েই মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন