‘মোজতবা খামেনি সুস্থ, নিরাপত্তার কারণে আড়ালে রয়েছেন’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩:৩১, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

‘মোজতবা খামেনি সুস্থ, নিরাপত্তার কারণে আড়ালে রয়েছেন’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় প্রাণ হারান ইরানের তখনকার সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। সে হামলায় আহত হন তার ছেলে এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।

বাবার মৃত্যুর পর দেশের দায়িত্ব নিলেও এরপর আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি মোজতবা খামেনিকে। এরপর থেকে তিনি কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমেই যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। এমনকি গত জুলাই মাসে শেষ হওয়া বাবার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও দেখা যায়নি মোজতবা খামেনিকে। ফলে তাঁর স্বাস্থ্য এবং তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা নিয়ে নানা গুজব সৃষ্টি হয়।

তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আব্দুল মজিদ হাকিম ঈলাহি জানিয়েছেন, মোজতবা খামেনি সুস্থ আছেন এবং পুরো কর্তৃত্ব নিয়ে দেশ পরিচালনা করছেন। ভারতের নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ’এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিট ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে এনডিটিভির সঙ্গে এই কথা বলেন তিনি।

আব্দুল মজিদ হাকিম ইলাহি এনডিটিভিকে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে একটি ৭ ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। আব্দুল মজিদ হাকিম ইলাহি বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারী এবং খুব সুন্দরভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

এমনকি আমাদের প্রেসিডেন্টও উল্লেখ করেছেন যে গত সপ্তাহে তিনি তাঁর সঙ্গে একটি ৭ ঘণ্টার বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া আমাদের পার্লামেন্টের স্পিকার আগামী পরশু এখানে (নয়াদিল্লী) আসবেন। তিনিও গতকাল বলেছেন যে শীর্ষ নেতার সঙ্গে তাঁর বহু ঘণ্টার বৈঠক হয়েছে। আমার এমন কিছু বন্ধু আছেন যারা তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তাঁরা আমাকে নিশ্চিত করে বলেছেন যে তিনি খুবই সুস্থ আছেন এবং নিজের দায়িত্ব খুব সুন্দরভাবে পালন করছেন।’

মোজতবা তাঁর বাবার শেষকৃত্যে অনুপস্থিত ছিলেন— এমন দাবি খণ্ডন করে এই জ্যেষ্ঠ ইরানি কূটনীতিক বলেন, ‘বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।

নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে তিনি মিডিয়ার সামনে আসেননি এবং কেউ তাঁকে দেখেনি। কিন্তু তিনি তাঁর বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিলেন। ওই সময় আমি ইরানেই ছিলাম। আমি তাঁর দুই ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছি। মোজতবা খামেনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এমনকি কোনো কোনো রাতে তিনি রাস্তায়ও নেমে আসেন। তিনি ইরানের সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলেও অংশ নিয়েছেন এবং বেশ ভালো আছেন।’

ইরানের সরকারি কর্মকর্তা এবং দেশের অন্যান্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, খামেনি এখনো দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি আড়াল থেকে শাসন পরিচালনা করছেন। কারণ তিনি তাঁর ক্ষতগুলো থেকে সেরে উঠছেন। একই সঙ্গে তিনি শীর্ষস্থানীয় একদল ব্যক্তির কাছে দৈনন্দিন কাজের ব্যাপক ক্ষমতা অর্পণ করেছেন।

শীর্ষ কর্মকর্তা এবং অন্যান্য ভেতরের সূত্রগুলো খামেনির এই অনুপস্থিতির পেছনে মূলত গুপ্তহত্যার ভয়কে দায়ী করছেন। তাঁরা বলছেন যে, তিনি শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন, সমস্ত প্রধান প্রতিবেদনগুলো গ্রহণ করছেন এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নিচ্ছেন। এমনকি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও, খামেনি তাঁর বাবার প্রধান সহকারী হিসেবে পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করতেই বেশি পছন্দ করতেন এবং জনসমক্ষে আসা এড়িয়ে চলতেন।

গত ২১ জুলাই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছিলেন যে সর্বোচ্চ নেতার সাথে যোগাযোগ দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু আগস্টের শুরুতে তিনি আবার বলেন যে খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করা অত্যন্ত কঠিন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষের দিকের ওই বৈঠকে সামরিক বিষয় এবং অর্থনীতি—যার মধ্যে সম্পদ নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রা ও জ্বালানির ব্যবহার পরিচালনা, সেইসাথে বিদেশি অংশীদারদের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গত মে মাসে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানিয়েছিল যে, পেজেশকিয়ান খামেনির সাথে বেশকয়েক ঘণ্টা বৈঠক করেছিলেন। মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর এটিই ছিল তাঁদের মধ্যে প্রথম জনসমক্ষে প্রকাশিত কোনো বৈঠকের খবর।

চলতি মাসের শুরুতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে, আট মাসে পা দেওয়া এই মার্কিন-ইসরায়েলি ও ইরান যুদ্ধের সময় ইরান আসলে কে চালাচ্ছে, তা কেউ জানে না। ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের নেতারা চলে গেছে, তাদের দ্বিতীয় সারির নেতারাও চলে গেছে এবং আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কেউ জানেই না যে আসলে কোন নরক এই দেশটা চালাচ্ছে।’

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে তাঁদের আসলে কতটা কর্তৃত্ব রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা যা বুঝতে পেরেছি, তার মধ্যে একটা বিষয় হলো, তাদের দেশ কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয় তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।’

এই অভিযোগের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন যে, মার্কিন কর্মকর্তারা খুব ভালো করেই জানেন তাঁদের ইরানি সমকক্ষ কারা এবং ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কিভাবে কাজ করে।

আরও পড়ুন