নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩:১৬, ৭ নভেম্বর ২০২৬
এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জাসদের বয়ান হচ্ছে, তারাই জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছিল। কিন্তু এই বয়ান সঠিক নয়। জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছিল টু ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি। এ কাজে নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন কর্নেল মহিউদ্দীন। ফোর বেঙ্গলও তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল।’
তিনি বলেন, ‘৭ নভেম্বর ভোর ৬টার দিকে তিনি টু ফিল্ডে গিয়ে দেখেন, জিয়াউর রহমান ইউনিটটির অধিনায়কের কার্যালয়ে বসে আছেন। তার পাশে ছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স (ডিএমও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরউদ্দীন খান। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর কর্নেল তাহের গণবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে টু ফিল্ডে আসেন। সেখানে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার কথা হয়। তাহের জিয়াকে তাদের সঙ্গে যেতে এবং সৈনিকদের সামনে তাদের ২১ দফা বা ১৭ দফা দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলতে বলেন। তবে জিয়াউর রহমান তাতে রাজি হননি। তিনি আগেই রেডিও ও টেলিভিশনে নিজের বক্তব্য পাঠিয়ে দিয়েছেন তুলে ধরে কোথাও যেতে অস্বীকৃতি জানান।’
অবসরপ্রাপ্ত এ সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘জিয়াউর রহমানকে একবার বাইরে নিয়ে যেতে পারলে তিনি (জিয়া) আর ফিরে আসতেন না। এতে কর্নেল তাহের ও জাসদের একাংশ নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারত।’
এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ওই দুটি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা তাকে অন্য কোথাও যেতে দেননি এবং টু ফিল্ড তাকে আগেই উদ্ধার করে নিয়ে আসে। অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ওই উত্তাল সময়ে কর্নেল হুদা কেন সম্পূর্ণ একটি ব্যাটালিয়ন (১০ বেঙ্গল) নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেছিলেন, তা আজও বড় রহস্য। মূলত জাসদের গণবাহিনীর পাশাপাশি কর্নেল হুদাদের এমন সামরিক পদক্ষেপের পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, ইতিহাসের সেই অজানা দিকটি তুলে ধরতেই প্রসঙ্গটি তোলেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের সাহসিকতা ও দূরদর্শিতা প্রসঙ্গে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের এ উপদেষ্টা বলেন, জিয়াউর রহমানের সততা ও সাহসিকতা ছিল অনন্য। তিনি হকি মাঠে লোডেড রাইফেল হাতে থাকা উচ্ছৃঙ্খল ট্রুপসদের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে তাদের শান্ত করেন। তার মনে কোনো প্রতিশোধস্পৃহা ছিল না।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যকার বিভেদ দূর করে মেজর জিয়া রিকনসিলিয়েশন বা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেনাবাহিনীর বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমান ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হয়ে এসে স্বাধীন নীতির সূচনা করেন তুলে ধরে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রথম দেশ হিসেবে তিনি চীন সফর করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে আল কুদস কমিটিতে ভূমিকা রাখেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আজ পর্যন্ত ঠিক করতে পারিনি। আমরা অনেক বছর ভারতকেন্দ্রিক থেকেছি। আমি কেন পার্শ্ববর্তী ভারতকে দায়ী করব, ভারতীয় হলে আমিও তাই করতাম।’
এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘যদিও ইরানের সাথে আমাদের তুলনা চলে না, কিন্তু আমাদের উচিত তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া।’
গত ১৫ বছরে সেনাবাহিনীর পেশাদারত্ব ও নৈতিকতা ধ্বংস করা হয়েছে মন্তব্য করে অবসরপ্রাপ্ত এ সেনা কর্মকর্তা বলেন, একটি দেশকে শক্তিশালী করতে হলে সেনাবাহিনীকে পুনরায় চরম পেশাদারত্বে ফিরে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোদাসসের হোসেন খান বীর প্রতীক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ড. ইউনূসকে আমি এখনো দাঁড়িয়ে বলব সবার সামনে, উনি মস্ত বড় একটা অপরাধ করে গেছেন। তড়িঘড়ি করে অল্প সময়ের মধ্যে ইলেকশনটা দিয়ে জাতির ক্ষতি করে দিয়ে গেছেন। এটা তো আপনার ম্যান্ডেট ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘জনতা এবং ছাত্ররা আপনাকে (ড. ইউনূস) ক্ষমতায় বসিয়েছে। আপনি কথা দিয়েছেন সংশোধন করবেন, স্বৈরাচারদের বিচার করবেন, হত্যার বিচার করবেন। এই কাজগুলো তো করলেন না। হঠাৎ করে আপনি রাজনৈতিক দলের চাপে নির্বাচন দিলেন। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কথায় কান দিয়ে সংস্কার না করেই মুহাম্মদ ইউনুস জাতির ক্ষতি করেছেন।’
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ভূ-রাজনীতি গবেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. আমিনুল করিম, রাওয়া চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট আবু রুশদ, মেজর (মেজর) মো. দেলোয়ার হোসেন খান প্রমুখ।