মানবসেবার অনন্য প্রতীক ‘গরিবের মা’ মরহুমা আয়েশা খাতুন

আল আমিন, রায়পুরা (নরসিংদী)

প্রকাশ: ১২:২৫, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬

মানবসেবার অনন্য প্রতীক ‘গরিবের মা’ মরহুমা আয়েশা খাতুন

কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নীরবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জীবনের পুরোটা সময় কাটিয়ে দেন। তাঁদের কাজের প্রচার থাকে না, কিন্তু প্রভাব থাকে গভীর। মরহুমা আয়েশা খাতুন ছিলেন তেমনই একজন মানুষ—যাঁকে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পীরপুর গ্রামের মানুষ ভালোবেসে ডাকত “গরিবের মা”। 

মরহুমা আয়েশা খাতুন জন্মগ্রহণ করেন ১ জুন ১৯২৩ সালে, পীরপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেকের মা। ড. সাদেক এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য। 

২৬ জানুয়ারি ২০০৬ সালে  ঢাকায় তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। কাকতালীয় হলেও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—এই দিনটি ছিল তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের জন্মদিন। পরিবারের ভাষায়, যেন আল্লাহ তাআলা তাঁর অসমাপ্ত মানবসেবার দায়িত্ব সন্তানের হাতে অর্পণ করে দেন। 

দরিদ্র মানুষ, অসহায় বিধবা, এতিম শিশু কিংবা রোগাক্রান্ত পরিবার—সবার কাছেই আয়েশা খাতুন ছিলেন নির্ভরতার নাম। তাঁর বাড়ির দরজা কখনো বন্ধ থাকত না। কেউ চাইলে, আবার কেউ না চাইতেও তিনি মানুষের খোঁজ নিতেন। যারা লজ্জায় সাহায্য চাইতে পারত না, তাদের কাছে তিনি নিজেই খবর পাঠাতেন। বিয়ে, চিকিৎসা কিংবা হঠাৎ কোনো বিপদে তিনি ছিলেন সবার শেষ আশ্রয়। 

পূর্ণ হিজাব পরিহিত এই পরহেজগার নারী সমাজে ন্যায়, বিবেক ও মানবিকতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও জটিল সামাজিক বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিতে আসতেন। কারণ সবাই জানত—তিনি ছিলেন পক্ষপাতহীন ও সত্যনিষ্ঠ। 

তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ গ্রামে পৌঁছালে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। অসংখ্য দরিদ্র মানুষ পায়ে হেঁটে ঢাকার পথে রওনা দেন তাঁদের “মা”-এর জানাজায় অংশ নিতে। পরে তাঁদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা হয়। এই দৃশ্য আজও এলাকাবাসীর স্মৃতিতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। 

মানবসেবার পাশাপাশি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সময়ও তিনি ছিলেন এক নীরব শক্তি—পরামর্শ, সাহস ও প্রেরণার মাধ্যমে।

আজ তাঁর স্মরণে আলীনগর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “আয়েশা খাতুন মহিলা মাদরাসা” এবং “মসজিদ আয়েশা”, যা তাঁর সদকায়ে জারিয়ার জীবন্ত নিদর্শন। পাশাপাশি তাঁর আদর্শকে এগিয়ে নিতে গঠিত হয়েছে “আয়েশা খাতুন ফাউন্ডেশন”। 

রমজান মাস আমাদের শেখায় অন্যের কষ্ট অনুভব করতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদ ব্যয় করতে। মরহুমা আয়েশা খাতুন এই শিক্ষা শুধু কথায় নয়, পুরো জীবন দিয়ে শিখিয়ে গেছেন। আজ আমরা যদি তাঁর মতো না-ও হতে পারি, অন্তত তাঁর দেখানো পথে হাঁটতে পারলেই তিনি সমাজে সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকবেন।

আরও পড়ুন