নতুন সরকারের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন

প্রকাশ: ১৯:১৮, ৮ মার্চ ২০২৬

নতুন সরকারের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই দেশের শিক্ষার্থীদের মনে জাগে নতুন আশা ও প্রত্যাশা। তাদের কাছে সরকার পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক পালাবদল নয় বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে বাস্তব অগ্রগতির সুযোগ। তারা চায় সময়োপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস পরিবেশ। পাশাপাশি বেকারত্ব নিরসন, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তরুণ প্রজন্ম কথার চেয়ে দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রত্যাশা করে। কারণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণই আগামীর সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর দেশ গঠনের ভিত্তি। এই ফিচারটি উপস্থাপন করেছেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন। 

সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুশাসন বহুল আলোচিত হলেও সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়। সুশাসন বলতে আইনের শাসনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, জনগণের অধিকার সুরক্ষা এবং দেশপ্রেমভিত্তিক শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনগণের প্রত্যাশা সবসময়ই উঁচু হলেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান হয়ে যায়। বিগত বছরের প্রতিনিধিদের মতো এবার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো নির্বাচনের পর মেঘের ওপর ভাসবে না তো?

উন্নত রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর সুশাসনের বিকল্প নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্ব হলো আইনের শাসনের মাধ্যমে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সাধারণ নাগরিক থেকে জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত সবাই আইনের আওতায় থাকবে। একই সঙ্গে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা ও নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এই চার স্তম্ভের ওপরই একটি রাষ্ট্রের টেকসই ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।


মোহাম্মদ ছরোয়ার

শিক্ষার্থী : সরকারি আলাওল কলেজ, চট্টগ্রাম


ভবিষ্যৎমুখী উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা

বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও উন্নত জাতি গড়ে ওঠে। তাই শুধু বর্তমানের উন্নয়ন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নিরাপদ এবং বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বর্তমানের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি প্রয়োগ জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূমিধস, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ও জীববৈচিত্র্য ক্ষয় ঘটছে, যা ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই এসব মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য।

পরিবেশ রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ করলে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমবে, মৃতপ্রায় নদীর সংখ্যা হ্রাস পাবে এবং মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ রোধ করা সম্ভব হবে। সবশেষে বলা যায়, সমন্বিত উদ্যোগেই ভবিষ্যৎমুখী উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

ফাহিমা আক্তার

শিক্ষার্থী, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকা

 

স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন

চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আমরা একটি নতুন সরকার পেয়েছি। আমরা একটি নির্বাচিত সরকার কাছে চাই, যারা চব্বিশের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করে দেশের সংস্কার ও জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে। মৌলিক অধিকারের মধ্যে বিশেষ করে দুটি খাতের অবস্থার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন তা হলো শিক্ষা ও চিকিৎসা। শিক্ষা খাতে বাজেট আরও বাড়ানো উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা দেশেই উন্নত শিক্ষা লাভ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে গবেষণা খাতে সরকারকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যদিকে আমাদের চিকিৎসা খাতের অবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর। জনগণ উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেকেই জমিজমা বিক্রি করে উন্নত চিকিৎসার জন্য বহু ব্যয় করে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। তাই নতুন সরকারকে সাশ্রয়ী খরচে জনগণের জন্য উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বোপরি, নতুন সরকারকে চব্বিশের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের অন্যান্য সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উত্তরণে বাজেট বৃদ্ধি করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।


আজিজুল হাকিম সামি

শিক্ষার্থী, সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, বরিশাল


আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মূল অধিকার হলো জান-মালের নিরাপত্তা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে এখনো এই নিরাপত্তা আশানুরূপভাবে নিশ্চিত হয়নি। প্রতিদিনই নানা রকম লোমহর্ষক হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ভাঙচুর ও লুটতরাজের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণসহ অমানবিক বিভিন্ন ঘটনা কয়েকদিন পরপরই পত্রিকার পাতার শিরোনাম হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এসব ঘটনা বিস্তৃত। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলাদলি, মারামারি, পেশিশক্তির আধিপত্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এ দেশে অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমনকি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী প্রার্থীসহ সমর্থকদের মর্মান্তিক মৃত্যুও ২০২৬ সালের মতো সময়েও ঘটেছে। ২০২৪ সালের বিপ্লবের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও নতুন কিছু প্রত্যাশা করেছিল জাতি। নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারে আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি উল্লেখ করেছে এবং প্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এমন আশা থাকলেও তা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, সে প্রশ্ন এখনো জনমনে রয়ে গেছে। তবে একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ জাতি গঠনের জন্য মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আগামী দিনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ জনগণের কাঙ্ক্ষিত শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র ও উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা।


নুসরাত জাহান জেরিন

শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইন কলেজ


সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্য হ্রাস

নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক ন্যায়বিচার ও বৈষম্য হ্রাসের মাধ্যমে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আজও আমাদের দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরকেন্দ্রিক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বেশি লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে একদিকে যেমন এসব অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে মানসম্মত সেবা ও সুবিধা পেতে শহরমুখী হতে হয়, তেমনি অন্যদিকে তা শহরকেন্দ্রিক জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি করে।

এ প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া—প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া সকল জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের সকল চাহিদা ও সুযোগ-সুবিধা নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। আমরা বিশ্বাস করি, নতুন সরকার এই বাস্তবতা অনুধাবন করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।


ইমরান মাহমুদ

শিক্ষার্থী, ডিগ্রি ৩য় বর্ষ

ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর


জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র চাই

ভোটের মাঠে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি দীর্ঘ ১৭ বছরের পর ভোট প্রদানে মানুষের উচ্ছ্বাস ও চোখেমুখে প্রত্যাশার বার্তা। এই একটি সুস্থ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেশের সামগ্রিক কাঠামোর পটপরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী। আমরা চাই, নির্বাচিত সরকার প্রতিটি সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠুক। একটি সাধারণ জীবন যাপনে যা কিছু প্রয়োজন, তার যোগান যেন নিশ্চিত, সহজতর ও ভোগান্তিবিহীন হয় এতে মানুষের দুর্ভোগ ও কষ্টের অবসান ঘটবে। এই ব্যাপারে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখতে চাই।

দেশে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং জনমতের প্রাধান্য দিতে হবে। দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হবে, যেন তা কেবল বেকার তৈরির কারখানা না হয়ে মানবসম্পদ তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের যে অনীহা তৈরি হচ্ছে, তা নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমরা আর বাঁচবার তাড়নায় ডানা-কাটা পাখির ন্যায় ছটফট করতে চাই না; এবার আমরা মুক্তবিহঙ্গের মতো স্বস্তির নিঃশ্বাসে, স্বপ্ন নিয়ে উঠতে চাই জগৎজুড়ে।


তৈয়বা খানম

শিক্ষার্থী, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন