হুমায়ুন কবির, বানারীপাড়া (বরিশাল)
প্রকাশ: ১৭:২৩, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই ভাসমান ধাপ পদ্ধতির চাষাবাদ দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থা। বর্ষাকালে জলাবদ্ধ ও নিচু জমি যখন প্রচলিত চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তখন কচুরিপানা, জলজ উদ্ভিদসহ বিভিন্ন জৈব উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয় ভাসমান ধাপ। পরে এর ওপর জৈব উপাদান ও মাটির সংমিশ্রণে তৈরি করা হয় চাষের উপযোগী বেড। সেখানেই শুরু হয় শাক-সবজি ও বিভিন্ন ধরনের চারার উৎপাদন।
বিশারকান্দি ও ইলুহারের জলাভূমিতে বর্ষার পানির ওপর সারি সারি ভাসমান ধাপ দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পানির বুকেই যেন গড়ে উঠেছে ছোট ছোট সবুজ বাগান। কোনো ধাপে সবুজ শাক, কোথাও সবজির চারা, আবার কোনো ধাপে বিভিন্ন কৃষিপণ্য বেড়ে উঠছে আপন মনে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, বর্ষাকালে তাদের অনেক জমি পানির নিচে চলে যায়। ফলে বছরের একটি বড় সময় প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না। আগে ওই সময়টুকু অনেকটা অলসভাবেই কাটাতে হতো। এখন ভাসমান ধাপ পদ্ধতির কারণে পানিতে থাকা অবস্থাতেও কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারছেন তারা।
স্থানীয় কৃষক রাকিব বলেন, বর্ষার সময় জমিতে পানি উঠে গেলে সেখানে ধান বা অন্যান্য ফসল করা সম্ভব হয় না। তখন ভাসমান ধাপই তাদের জন্য বিকল্প হয়ে ওঠে। নিজেদের শ্রম ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ ব্যবহার করে ধাপ তৈরি করা যায় বলে এটি তাদের কাছে বেশ কার্যকর।
কৃষক জামাল মিয়া জানান , ধাপে উৎপাদিত সবজি ও চারা নিজেদের পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা যায়। এতে বাড়তি আয় হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বাজারে তাজা শাক-সবজির চাহিদা থাকায় ভালো দাম পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
কৃষকেরা জানান, ভাসমান ধাপ তৈরি ও পরিচর্যায় শ্রম দিতে হয়। ধাপ প্রস্তুত করা, চাষের উপযোগী করে তোলা, বীজ বা চারা রোপণ, নিয়মিত পরিচর্যা এবং ফসল সংগ্রহ—সবকিছুতেই বাড়তি শ্রম প্রয়োজন। তবে জমি পানিতে ডুবে থাকার সময়ও উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারায় এ পদ্ধতির প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, ভাসমান ধাপের চাষে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ পাওয়া গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা গেলে তারা আরও বেশি লাভবান হতে পারবেন।
বানারীপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তনয় সিংহ বলেন, “বিশারকান্দির ভাসমান শস্য ও চারা চাষ একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থা। এটিকে আরও আধুনিক ও উন্নত করার পরিকল্পনা নিয়ে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। এ চাষের সঙ্গে জড়িত কৃষকদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনারও চেষ্টা চলছে।”
তিনি আরও বলেন,“ভাসমান চাষাবাদ করতে গিয়ে কৃষকেরা যাতে কোনো ধরনের সমস্যার মুখোমুখি না হন, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এই সম্ভাবনাময় কৃষি ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারণ ও টেকসই করতে স্থানীয় কৃষকদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
স্থানীয়দের মতে, ভাসমান ধাপ শুধু একটি কৃষি পদ্ধতি নয়, বরং জলাবদ্ধ এলাকার মানুষের টিকে থাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহ্য। বছরের যে সময়ে জমি পানির নিচে থাকে, সেই সময়টুকুকেও উৎপাদনের কাজে লাগানোর সুযোগ করে দেয় এ ব্যবস্থা।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পানির ওপর চাষাবাদের মতো অভিযোজনভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের বীজ ও চারা, প্রযুক্তিগত পরামর্শ, সহজ শর্তে কৃষি সহায়তা এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে ভাসমান চাষাবাদ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ও ইলুহারের পানির বুকে ভাসমান সবুজ ধাপ তাই শুধু কৃষকের জীবিকার গল্প নয়; এটি প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে কৃষকের টিকে থাকার গল্প। পানিতে ডুবে থাকা জমিকে উৎপাদনের আওতায় এনে স্থানীয় কৃষকেরা যেন প্রমাণ করছেন—জমি ডুবলেও কৃষকের স্বপ্ন ডোবে না।