নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩:৪৪, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) পরিচালিত এক সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত গণসংলাপে সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য কাজে লাগিয়ে দরিদ্র পরিবার শনাক্তকরণ এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের প্রস্তাব তুলে ধরে ক্যাব।
এক দশকে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন
সমীক্ষায় দেখা যায়, গত এক দশকে লাইফলাইন গ্রাহকদের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এসময়ে ৮৫ শতাংশ পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে। ৭৭ শতাংশ পরিবারের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রিজের মালিকানা ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে এবং টেলিভিশনের মালিকানা ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া ৭৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, বিদ্যুতের কারণে পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হয়েছে। রাতে বিদ্যুতের কারণে বেশি নিরাপদ বোধ করেন বলে জানিয়েছেন ৯৭ শতাংশ উত্তরদাতা।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার ৩৩৪টি এবং শৈলকুপা পৌর এলাকার ২২২টি মিলিয়ে মোট ৫৫৬টি পরিবারের ওপর পরিচালিত তুলনামূলক সমীক্ষায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সমীক্ষায় চারটি ক্ষেত্রে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়। এতে মোট ১৩২ দশমিক ২৮ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা চিহ্নিত হয়েছে।
এর মধ্যে ৩১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৫২ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট-পিক, ১৫০টি কলেজ এলাকায় ৫১ দশমিক ১২ মেগাওয়াট-পিক, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৪ দশমিক ৬০ মেগাওয়াট-পিক এবং শৈলকুপা পৌর এলাকায় ৪ দশমিক ০৬ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্যাবের প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব গড়ে তুলে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পরিবারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারকে দারিদ্র্য শনাক্তকরণের একটি সম্ভাবনাময় নির্দেশক হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটির মতে, নিয়মিত মিটার রিডিংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবার চিহ্নিত করা গেলে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাইয়ের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
এতে দরিদ্র পরিবার খুঁজে বের করতে আলাদাভাবে সময় ও অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন কমবে। সমাজকল্যাণ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর বিকল্প হিসেবেও এ পদ্ধতি বিবেচনার সুপারিশ করেছে ক্যাব। সংগঠনটির হিসাবে, এ পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুই হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২১৬ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ১২ দফা কর্মপরিকল্পনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে পদ্ধতি চালু, দায়িত্ব ও সমন্বয় নির্ধারণ, মিটার ও প্রকৃত পরিবারের সম্পর্ক যাচাই, ধারাবাহিক ১২ মাসের প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় তথ্য দিয়ে ব্যবহারের সীমা যাচাই, প্রতিনিধিত্বশীল এলাকায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্বাধীন তুলনামান প্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি পদ্ধতিটি গ্রহণযোগ্য কি না, তা যাচাইয়ের মানদণ্ড আগেই নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের ভিত্তিতে দরিদ্রতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা। কারণ, প্রত্যন্ত ও চরাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আবার অনেক দরিদ্র পরিবার ভাগাভাগি করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ফলে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেই কোনো পরিবার দরিদ্র—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
গণসংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করতেই আওয়ামী লীগ সরকার দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল। জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে কোনো খাতেই অনিয়মের সুযোগ থাকবে না। গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রতিটি খাত ও প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জানান, দেশে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চল ও চরাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত। দরিদ্র অনেক পরিবারকে ভাগাভাগি করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। তাই শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে হতদরিদ্র মানুষের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা কঠিন।
রিজভী বলেন, দারিদ্র্য নিরূপণের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। এ বিষয়ে আয়োজকদের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে নতুন ধারণা ও প্রশ্ন সামনে আনা প্রয়োজন। কোনো পরিসংখ্যানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে তা যাচাই-বাছাই করতে হবে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও আগ্রহ আছে। নিজেদের চাহিদা পূরণের পর উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহসহ সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার অনেক কম। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারে স্থানীয় পর্যায়ে তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে সরকারকে কার্যকর নীতি ও প্রণোদনা দিতে হবে।
গবেষক ও সাংবাদিক কাজল রশীদ শাহীন বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্য নিরূপণের প্রস্তাবটি সময়োপযোগী। তবে এ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পরিবার যাতে ভুলভাবে তালিকা থেকে বাদ না পড়ে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
স্ট্যামফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শিহাব উদ্দিন বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের এ সমীক্ষা বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগের নিরাপত্তা, স্বচ্ছ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।
তিনি জানান, স্ট্যামফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের সৌর প্যানেল স্থাপন ও এনার্জি অডিট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।
গবেষক আনিস রায়হান বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গণসংলাপে ক্যাব তিনটি প্রধান সুপারিশ তুলে ধরে। এগুলো হলো—সরকারের ব্যয়বহুল প্রকল্পের বিকল্প হিসেবে পরিবারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারকে দারিদ্র্য শনাক্তকরণের প্রাথমিক নির্দেশক হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রহণ; স্থানীয় পর্যায়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং লাইফলাইন গ্রাহকদের সহায়তার পরিমাণ ও বিতরণ পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের গবেষণা সমন্বয়ক প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। এতে সরকার, নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে ক্যাব।