রাষ্ট্রপতি

এআই ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্ভাবনেও নেতৃত্ব দিতে হবে বাংলাদেশকে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬:০৯, ৫ নভেম্বর ২০২৬

এআই ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্ভাবনেও নেতৃত্ব দিতে হবে বাংলাদেশকে

বাংলাদেশকে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে নয়, বরং এআই প্রযুক্তির প্রয়োগ ও উদ্ভাবনে সক্ষম দেশে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেছেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নিষ্ক্রিয় অংশীদার নয়, বরং সক্রিয় অংশীদার হওয়াই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এআইনির্ভর নয়, বরং এআই সক্ষম, উদ্ভাবনসমৃদ্ধ ও মানবকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে এক মহাপরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আগামী দশকে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানও অনেকাংশে নির্ভর করবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার ওপর।

তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রযুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কোটি তরুণের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এআইকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে হবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তরুণদের প্রযুক্তিবান্ধব ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তারা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় আগামী কয়েক বছরে এআই বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য সংযোজন করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশকেও এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে।

ব্যবসায়ী সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এআইকে শুধু ব্যয় কমানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখলে চলবে না। নতুন পণ্য ও সেবা সৃষ্টি, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যম হিসেবেও এ প্রযুক্তিকে বিবেচনা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বে বাংলাদেশকে পরিচিতি দিয়েছে। একইভাবে দেশের তরুণরা যথাযথ দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারলে তারাই বিশ্বে বাংলাদেশকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করার সম্ভাবনা রাখে।

এআইয়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে মূল্যবোধকেন্দ্রিক জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এতে নৈতিকতা, মানবাধিকার, ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয় এআই সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও চলছে।

তবে এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এআইয়ের সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যখন শিক্ষিত বেকার, তখন এআই নতুন করে বেকারত্ব সৃষ্টি করবে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এ প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রতিটি পর্যায়ে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এআইয়ের নিরাপদ ব্যবহার ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো প্রযুক্তি গ্রহণের আগে সেটি কতটা টেকসই এবং দেশের জন্য কতটা উপযোগী, তা বিচার করতে হবে। মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতে পারে—এমন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম নির্ধারক।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে এআইয়ের অবদান প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বাংলাদেশকে এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে এআইয়ের কৌশলগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এআইবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে। আধুনিক প্রযুক্তির নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করতে জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।

তিনি আরও জানান, স্থানীয় সমস্যার প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান তৈরিতে দেশীয় নতুন উদ্যোগ ও গবেষকদের গবেষণা অনুদান দেওয়া, নতুন উদ্যোগ বিকাশের সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে কণ্ঠস্বরের নির্দেশনার মাধ্যমে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে শক্তিশালী বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি তৈরির কাজও চলছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এআই ও যন্ত্রশিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতন থাকার পাশাপাশি মানবকল্যাণে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, পণ্য পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বেসরকারি খাতে এআই ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ সহযোগিতায় বাংলাদেশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করা হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ এম. রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সরকারের নীতি ও রূপরেখা অনুযায়ী এআইয়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তরুণ সমাজ, উদ্যোক্তা ও গবেষকদের এআই, উপাত্ত বিজ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা এবং যন্ত্রশিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে। উদ্যোক্তারা যাতে অপ্রয়োজনীয় বাধা ও হয়রানি ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে জন্য অবাধ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন তাঁর বক্তব্যে সমন্বিত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি, জীবপ্রযুক্তি ও রোবটবিদ্যার মতো অগ্রসর প্রযুক্তির সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করছে মন্ত্রণালয়।

এ জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, গবেষণার ফল বাণিজ্যিক প্রয়োগে নিয়ে যাওয়া, নতুন উদ্যোগ ও শিল্পে উদ্ভাবনের বাণিজ্যিকীকরণ এবং অগ্রসর প্রযুক্তিতে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সচিব আরও বলেন, গত জুলাইয়ে ‘বিয়ার সামিট’, অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি বিষয়ক সিম্পোজিয়াম এবং সেপ্টেম্বরে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ আয়োজনের মাধ্যমে উদ্ভাবক, গবেষক ও বিনিয়োগকারীদের এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার, তথ্য সুরক্ষা এবং দেশের নিজস্ব চাহিদা পূরণে জাতীয় এআই প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

সরকারের একার পক্ষে এ রূপান্তর সম্ভব নয় উল্লেখ করে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের কার্যকর অংশীদারত্বের মাধ্যমে শক্তিশালী জাতীয় উদ্ভাবনব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক রেডিনেস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাবেক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, উদ্ভাবক, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে রাষ্ট্রপতিকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। পরে তিনি অতিথিদের নিয়ে সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে সামিট উপলক্ষে স্থাপিত বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।

উল্লেখ্য, এবারের সামিটে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি, প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং তরুণ উদ্ভাবকসহ ১৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান তাদের উদ্ভাবন প্রদর্শন করছে। পাশাপাশি ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও তরুণ উদ্ভাবকরা নিজেদের এআই প্রকল্প তুলে ধরছেন।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন