ইবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২:৫৫, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশ্বজিত চন্দ্র দাসের বাড়ি ঝিনাইদহের ত্রিবেণী এলাকায়। সংসারে স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। সীমিত আয়ের মধ্যেই চলে তাঁর পরিবার। তবু জীবনের প্রতি রয়েছে দৃঢ়তা আর পরিশ্রমের প্রতি অটল শ্রদ্ধা।
প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে তিনি ক্যাম্পাসের আমবাগানের মেহগনি গাছের সামনে বসেন। সেখানে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করেন। সন্ধ্যার পর সাড়ে ৮টা পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন আবাসিক হলে গিয়ে কাজ করে থাকেন।
বৃহস্পতিবার ও শনিবার শাহ আজিজুর রহমান হলে, শুক্রবার ও রবিবার শহীদ জিয়াউর রহমান হলে, মঙ্গলবার লালন শাহ হলে এবং সোমবার ও বুধবার সাদ্দাম হোসেন হলে।
এই দীর্ঘ সময়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের অনেকেই তাঁকে চেনেন এবং প্রয়োজনের সময় তাঁর কাছেই আসেন।
মুচির কাজ করে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয় তাঁর। এই আয় দিয়েই চলে পরিবারের যাবতীয় খরচ। ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলে তিনি বিভিন্ন বাড়িতে বসে কাজ করেন, যাতে আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
বিশ্বজিত চন্দ্র দাস জানান, একসময় মুচির কাজের পাশাপাশি তিনি থানায় প্রায় ১৬ বছর পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন। তবে চাকরিটি স্থায়ী না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা ছেড়ে দিতে হয়। পরে মাঈশা কোম্পানিতেও চাকরি করেছিলেন। কিন্তু সেখানে নিয়মিত বেতন না পাওয়া ও কর্মপরিবেশ ভালো না হওয়ায় সে চাকরিও ছেড়ে দেন।
“সংসার চলে যায়, এইটাই বড় কথা,” বলেন বিশ্বজিত চন্দ্র দাস।
ক্যাম্পাসে কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয় না বলেও জানান তিনি। বরং পরিচিত পরিবেশ, মানুষের সহযোগিতা ও সম্মানবোধ তাঁকে স্বস্তি দেয়। পরিবারে সবাই সুস্থ আছে, এটিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় শান্তির বিষয়।
শহীদ জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিন সজিব বলেন, “বিশ্বজিত দাদা আমাদের ক্যাম্পাসের নীরব পরিশ্রমী মানুষদের একজন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর আচরণ ও পরিশ্রম আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। এমন মানুষদের সম্মান দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।”
আরেক শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা অনেক সময় ক্যাম্পাসের এমন মানুষদের গুরুত্ব দিই না, কিন্তু বিশ্বজিত দাদার মতো মানুষরাই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ও মানবিক দিককে ধরে রেখেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর জীবনসংগ্রাম আমাদের অনেক কিছু শেখায়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো মানুষের ভিড়ে বিশ্বজিত চন্দ্র দাস হয়তো খুব পরিচিত মুখ নন, কিন্তু তাঁর দীর্ঘদিনের শ্রম, সততা ও আত্মসম্মান তাঁকে নিঃসন্দেহে ক্যাম্পাসের এক নীরব অনুপ্রেরণায় পরিণত করেছে। জীবনসংগ্রামের মাঝেও কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধই তাঁকে আজও প্রতিদিন সকালে আমবাগানের মেহগনি গাছের নিচে বসতে শক্তি জোগায়।