আনোয়ারুল ইসলাম রনি, রংপুর
প্রকাশ: ২০:০২, ১৫ আগস্ট ২০২৬
রংপুরের হারাগাছসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এভাবেই বিড়ি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজার হাজার শ্রমিক। রংপুর বিভাগের আট জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন শ্রমিকরা। তাদের বড় একটি অংশ নারী, যারা সংসারের কাজ সামলে বাড়িতে বসেই বিড়ি তৈরির কাজ করেন।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ জেলায় প্রতিদিন কম-বেশি ১০ হাজার মানুষ বিড়ি তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকেন। স্থানীয় বিভিন্ন বিড়ি কারখানা থেকে বাড়িতে বিড়ি তৈরির উপকরণ দেওয়া হয়। এরপর শ্রমিকরা বাড়িতে বসেই বিড়ি তৈরি করে তা কারখানায় জমা দেন।
একজন শ্রমিক প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ হাজার বিড়ি তৈরি করেন। কেউ কেউ পাঁচ থেকে সাত হাজার পর্যন্ত বিড়ি তৈরি করেন। প্রতি হাজার বিড়ির জন্য পাওয়া যায় মাত্র ১৫ থেকে ২০ টাকা। ফলে হাজার হাজার বিড়ি তৈরি করেও তাদের আয় খুব সীমিত।
বিড়ি শ্রমিক শাহনাজ পারভিন বলেন, “প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত হাজার বিড়ি তৈরি করি। সংসার সামলানোর পাশাপাশি এই কাজ করি। দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। টাকা কম হলেও সংসারে সহযোগিতা হয়।”
আরেক শ্রমিক মেহেরবানু বলেন, “বিড়ি বানিয়ে প্রতিদিন যে টাকা আয় হয়, সেটা দিয়ে আমার সন্তানের পড়ালেখার খরচ যোগান দিই। অনেক কষ্ট করে কাজ করতে হয়। তারপরও সন্তানের জন্য কাজটা করতে হয়।”
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিড়ি তৈরির কাজ দেখতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি বেশ কষ্টসাধ্য। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় বসে থাকতে হয়। দ্রুত হাতে একটির পর একটি বিড়ি তৈরি করতে হয়। যত বেশি বিড়ি তৈরি করা যায়, আয়ও তত বাড়ে। ফলে অনেকেই সংসারের কাজ শেষ করে দীর্ঘ সময় এই কাজে ব্যস্ত থাকেন।
বিশেষ করে নারীদের জন্য এই কাজটি অনেকটা ঘরে বসে আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। সন্তানদের দেখাশোনা, রান্না-বান্না ও সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি তারা বিড়ি তৈরি করেন। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই রয়েছে কম মজুরি ও কঠোর শ্রমের বাস্তবতা।
রংপুর বিভাগের আট জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বিড়ি শ্রমিকদের জীবনচিত্রও অনেকটা একই রকম। কেউ সংসারের খরচ মেটাতে, কেউ সন্তানের পড়ালেখার ব্যয় চালাতে, আবার কেউ পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
একজন শ্রমিকের প্রতিদিনের আয় নির্ভর করে তিনি কতগুলো বিড়ি তৈরি করতে পারছেন তার ওপর। অসুস্থতা, পারিবারিক কাজ বা অন্য কোনো কারণে উৎপাদন কমে গেলে আয়ও কমে যায়। ফলে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকলেও তাদের কাজের চাপ থাকে প্রতিদিনই।
হারাগাছের বাড়ির আঙিনা থেকে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকার ঘরে ঘরে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার বিড়ি। এই উৎপাদনের পেছনে থাকা শ্রমিকদের অনেকেই পান সামান্য পারিশ্রমিক। অথচ সেই সামান্য আয় দিয়েই তারা চালান সংসার, মেটান সন্তানের পড়াশোনার খরচ।
তাদের কাছে বিড়ি তৈরি শুধু একটি পেশা নয়, এটি বেঁচে থাকার অবলম্বন। বাড়ির আঙিনায় পাশাপাশি বসে থাকা তিন নারীর হাতে তৈরি হওয়া প্রতিটি বিড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের শ্রম, ঘাম, অভাব আর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন। অল্প আয়ের এই কাজেই তাই প্রতিদিন নতুন করে শুরু হয় বিড়ি শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু অগ্রযাত্রা প্রতিদিনকে বলেন, “বিড়ি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নারী ও শিশুরা একদিকে ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। দীর্ঘদিন বিড়ি তৈরির কাজে যুক্ত থাকায় তাদের নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং একপর্যায়ে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধিতেও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শিশুদের কোনোভাবেই এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত করা উচিত নয়। শিশু শ্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি বিড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত নারীদের জন্য নিরাপদ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।”