মোঃআহছান উল্লাহ, কুমিল্লা
প্রকাশ: ১৬:১১, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় দেশের অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে। এবার এই বোর্ডে পাসের হার নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সাথে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই সামগ্রিক ভরাডুবির মধ্যে বোর্ডের অধীনস্থ ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এমন নজিরবিহীন ফল বিপর্যয়ের ঘটনায় পুরো বোর্ড জুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে এবং শিক্ষাঙ্গনসহ অভিভাবকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১১টায় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড মিলনায়তনে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
বোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এ বছর কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৯২ হাজার ১৬২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে মাত্র ৪৪ হাজার ২৭২ জন এবং অনুত্তীর্ণ হয়েছে ৪৭ হাজার ৮৯০ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী এবার অকৃতকার্য হয়েছে। গত বছর (২০২৫ সালে) এই বোর্ডে পাসের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা এবার আরও শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
পাসের হারের পাশাপাশি বড় ধাক্কা এসেছে জিপিএ-৫ এর সংখ্যায়। এবার মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩১৩ জন শিক্ষার্থী (যার মধ্যে ৮২১ জন ছাত্রী এবং ৪৯২ জন ছাত্র)। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২ হাজার ৭০৭ জন। সেই হিসাবে এবার জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা কমেছে ১ হাজার ৩৯৪ জন। বোর্ডে বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো করলেও ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। মূলত আবশ্যিক ইংরেজি এবং উচ্চতর গণিত বিষয়ে ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করায় সামগ্রিক ফলাফলের এই ধস নেমেছে বলে জানান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তবে বরাবরের মতো এবারও পাসের হার ও জিপিএ-৫ উভয় ক্ষেত্রেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। মেয়েদের পাসের হার ৫১ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং ছেলেদের পাসের হার ৪৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জানান, বোর্ডের আওতাধীন ৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন করলেও ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থীই অনুত্তীর্ণ হয়েছে। শূন্য পাস করা এই ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে লক্ষ্মীপুর জেলায়।
জেলা ভিত্তিক তালিকায় রয়েছে— চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার চাঁদপুর পৌর শহিদ জাভেদ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মতলব দক্ষিণ উপজেলার ডা. এম. শামসুল হক মডেল কলেজ। কুমিল্লা জেলার লালমাই উপজেলার সুরুজ মেমোরিয়াল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার কেমব্রিজ সিটি কলেজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. মমতাজ উদ্দিন আলোকিত কলেজ, প্রফেসর সেকান্দার আলী ভুঁইয়া গার্লস হাই স্কুল এবং লক্ষ্মীপুর পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ। একই জেলার কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ফজুমিয়ার হাট হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার জিনদপুর ইউনিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বগোইর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ এবং বীরগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এ ছাড়া ফেনী সদর উপজেলার বেগম শামসুন নাহার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বেকন মডেল কলেজ এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আপার মডেল কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন।
এই নজিরবিহীন ফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে জরুরি ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে বোর্ডের সচিব অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারবে না—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কেন এবং কী কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে এমন চরম বিপর্যয় ঘটল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়াসহ কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বোর্ড সচিব আরও জানান, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং ফলাফলের গুণগত মান বাড়াতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ তদারকি সেল গঠন করে সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজন করা হবে। একই সাথে মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো সরাসরি চিহ্নিত করতে জরুরি অভিভাবক সমাবেশ করার পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে শিক্ষা বোর্ড। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষকের ঘাটতি, নিয়মিত পাঠদানের অভাব, শিক্ষকদের জবাবদিহিতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির দুর্বলতার কারণেই এই নজিরবিহীন শূন্য পাসের ঘটনা ঘটেছে।