এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
প্রকাশ: ২৩:১২, ৯ অক্টোবর ২০২৬
কোলেলিথিয়াসিস, যা সাধারণভাবে পিত্তথলিতে পাথর বা গলস্টোন রোগ নামে পরিচিত, বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ক্রমেই স্বীকৃতি পাচ্ছে। প্রচলিতভাবে এই রোগ মধ্যবয়সী ও বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায় বলে মনে করা হলেও, সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে শিশু ও তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যেও পিত্তথলিতে পাথর দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তন রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং জনস্বাস্থ্য কৌশলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
কোলেলিথিয়াসিস হলো এমন একটি অবস্থা, যখন মূলত কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিনের মতো কঠিন উপাদান জমাট বেঁধে পিত্তথলির ভেতরে পাথর তৈরি করে। এসব পাথরের কারণে পিত্তনালির ব্যথা, পিত্তথলির প্রদাহ (কোলেসিস্টাইটিস) এবং চিকিৎসা না করা হলে অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ (প্যানক্রিয়াটাইটিস)-এর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে পেটব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি এবং বদহজম। অনেক সময় এসব উপসর্গকে অন্যান্য পরিপাকতন্ত্রের রোগের সঙ্গে ভুল করে মিলিয়ে ফেলা হয়।
বাংলাদেশে বিভিন্ন গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল প্রতিবেদনে এখন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী মানুষের মধ্যে, এমনকি কিশোর-কিশোরী ও শিশুদের মধ্যেও পিত্তথলিতে পাথরের ঘটনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রবণতার পেছনে কয়েকটি কারণ ভূমিকা রাখতে পারে:
১. খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন
নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। ভাজাপোড়া খাবার, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এবং ফাস্টফুডের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কোলেস্টেরলের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যা পিত্তথলিতে পাথর তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ কারণ।
২. স্থূলতা ও অলস জীবনযাপন
শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে স্থূলতার হার বৃদ্ধি পিত্তথলিতে পাথর তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত। শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস কমে যাওয়া ও দীর্ঘসময় নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন পিত্তথলির স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে এবং পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৩. জেনেটিক ও জাতিগত কারণ
বাংলাদেশের কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যা পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
৪. স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ও রোগ নির্ণয়
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে উন্নত রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা সহজলভ্য হওয়ায় পিত্তথলিতে পাথরের রোগ শনাক্ত করার হার বেড়েছে। আগে যেসব রোগ শনাক্ত না হয়ে থেকে যেত, বর্তমানে সেগুলোও বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কম বয়সী রোগীদের মধ্যেও রোগের উপস্থিতি বেশি ধরা পড়ছে।
চ্যালেঞ্জ ও এর প্রভাব
সব বয়সী মানুষের মধ্যে কোলেলিথিয়াসিসের উপস্থিতি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে:
প্রাথমিক রোগ নির্ণয়: শিশু ও তরুণদের ক্ষেত্রে উপসর্গ অনেক সময় অস্পষ্ট বা স্বাভাবিকের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বিলম্ব হতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ: বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে রোগীর সংখ্যা বাড়লে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে কোলেসিস্টেকটমির মতো অস্ত্রোপচারের জন্য আরও জনবল ও চিকিৎসা সম্পদের প্রয়োজন হতে পারে।
সচেতনতা ও প্রতিরোধ: সাধারণ মানুষের মধ্যে পিত্তথলিতে পাথর সম্পর্কে সচেতনতা এখনও সীমিত। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশে কোলেলিথিয়াসিসের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মোকাবিলায় একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে:
গবেষণা: বিভিন্ন বয়সে রোগের প্রকোপ এবং বয়সভিত্তিক ঝুঁকির কারণগুলো বোঝার জন্য বিস্তারিত মহামারিবিদ্যাগত গবেষণা পরিচালনা করা।
জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ: স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব প্রচার করা।
স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ: শিশু ও তরুণদের মধ্যে পিত্তথলিতে পাথরের রোগ দ্রুত শনাক্ত ও যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
নীতিগত সহায়তা: রোগীদের চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করার জন্য রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করা।
কোলেলিথিয়াসিস বা পিত্তথলিতে পাথর এখন আর শুধু বয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে এটি বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে দেখা দিতে পারে এবং এই প্রবণতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গবেষণা, জনসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশে পিত্তথলিতে পাথরের রোগ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং এর সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত বোঝা কমানো সম্ভব।
লেখক:
ব্যাচ: ইউএমসি ০৭
সেশন: ২০২০–২১
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ