পাথরের বদলে ইট-বালু, ১২ কোটি টাকার সংস্কারকাজে প্রশ্ন

আলমগীর হোসেন ফয়সাল, লক্ষ্মীপুর: 

প্রকাশ: ১৯:৩১, ৭ অক্টোবর ২০২৬

পাথরের বদলে ইট-বালু, ১২ কোটি টাকার সংস্কারকাজে প্রশ্ন

প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের সংস্কারকাজ চলছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত ভরাট ও সংস্কারকাজে পাথরের পাশাপাশি ইটের সলিং, ইটের টুকরো ও বালু ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এতে চলমান সংস্কারকাজের গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও যানবাহন চালকরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় থাকা সড়কটির বিভিন্ন অংশে স্থায়ী সংস্কারের পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে ইট ও বালু দিয়ে গর্ত ভরাট করে সাময়িকভাবে মেরামত করা হয়েছে। যানবাহনের চাপে এসব ইটের টুকরো দ্রুত সরে গিয়ে আবারও গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও জনদুর্ভোগ।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সকালে সরেজমিনে রায়পুর উপজেলার চাঁদপুর বর্ডার বাজার থেকে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত দেখা গেছে। কোথাও পিচ উঠে গিয়ে সড়ক উঁচু-নিচু হয়ে আছে, আবার কোথাও সৃষ্টি হয়েছে গভীর খানাখন্দ। বিশেষ করে মাইলের মাথা, রাখালিয়া, পাটোয়ারী রাস্তার মাথা, বাসাবাড়ী বাজার, সিকদার রাস্তার মাথা, রুস্তম আলী ডিগ্রি কলেজ গেট, মহিলা কলেজ গেট, সরকারি হাসপাতাল, লেংড়া বাজার ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়কের অবস্থা বেশি নাজুক।

সরেজমিনে কোনো কোনো স্থানে গর্তে ইটের টুকরো ও বালু ফেলে রাখা এবং কোথাও ইটের সলিং করতে দেখা গেছে। দ্রুতগতির যানবাহন চলাচলের সময় ইটের টুকরো ছিটকে সড়কের পাশে পড়ছে। পাশাপাশি ইট ও অন্যান্য উপকরণ ভেঙে ধুলাবালু সৃষ্টি হওয়ায় সড়কের পাশের দোকানপাট, পথচারী ও ছোট যানবাহনের চালকদের দুর্ভোগ বাড়ছে।

স্থানীয় যানবাহন চালকদের ভাষ্য, গর্তে ইটের খোয়া ফেলে সাময়িকভাবে মেরামত করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই যানবাহনের চাপে তা সরে যায়। পরে একই স্থানে আবারও গর্ত তৈরি হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন চালক বলেন, গর্ত ভরাটে ইটের খোয়া বা অন্য কোনো উপকরণ ব্যবহার করা হলে সেটি কোন ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতির অংশ, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। প্রকল্পে নির্ধারিত উপকরণ, পরিমাণ ও কারিগরি স্পেসিফিকেশন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা প্রয়োজন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে কাজ করলে তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। সরকারি অর্থ ব্যয়ে সংস্কারকাজ হওয়ায় ব্যবহৃত উপকরণের মান, কাজের পরিমাণ ও কারিগরি মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা দরকার।

এদিকে দীর্ঘদিনের বেহাল অবস্থার কারণে শুধু রায়পুর নয়, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর তেমুহনী থেকে রায়পুর পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশেও যান চলাচলে ভোগান্তি হচ্ছে। দূরপাল্লার যানবাহনের চালকরা জানান, কোথাও গর্ত, আবার কোথাও ঢেউয়ের মতো উঁচু-নিচু সড়কের কারণে যানবাহন চালাতে সমস্যা হচ্ছে। এতে যানবাহনের টায়ার, টিউব ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি যাত্রীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক দশক ধরে সড়কটির বিভিন্ন অংশে এমন দুরবস্থা চলছে। বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষা কিংবা অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ পড়লে সংস্কার করা অংশগুলো দ্রুত আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে পাথরের পরিবর্তে ইট ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তা। রায়পুর ও রামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আরিফ হোসেন বলেন, বিভিন্ন কারণে সড়কে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তাৎক্ষণিকভাবে এসব গর্তে ইট-বালুর সঙ্গে পাথরও ফেলে মেরামত করা হচ্ছে। ইট দিয়ে সংস্কারের প্রক্রিয়াটি প্রাথমিক কাজের অংশ।

তিনি বলেন, প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থায়ীভাবে ইট, পাথর ও বিটুমিন ব্যবহার করে মহাসড়কের সংস্কারকাজ করা হচ্ছে। ধুলাবালু নিয়ন্ত্রণে সড়কে পানি ছিটানোর জন্য ঠিকাদারকে বলা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর সংস্কারকাজ কতটা টেকসই হয়েছে, তার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। তবে তার আগেই ব্যবহৃত উপকরণ, পরিমাণ, কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও গুণগত মান যাচাই করা হলে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন