রঞ্জিত কুমার শীল, পাবনা
প্রকাশ: ১১:২৭, ৮ অক্টোবর ২০২৬
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে ১৬ দশমিক ১ মেগাপ্যাসকেল (এমপিএ) পরিচালন চাপ ও ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রেখে ১২টি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে ভালভগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার শুরুতে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও পরে তা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এর আগে ভালভে ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর তা মেরামতে রাশিয়ার সহযোগিতা নেয় বাংলাদেশ। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ দল রূপপুরে এসে একে একে নয়টি ভালভ মেরামত করে। এরপর বিভিন্ন ধাপে ভালভগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্ধারিত ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভালভ একসঙ্গে খুলে অতিরিক্ত চাপ নির্গত করে প্ল্যান্টকে নিরাপদ রাখার কথা। তবে প্রাথমিক পরীক্ষায় দুটি ভালভ খুলতে ব্যর্থ হয়। ফলে নির্ধারিত মানদণ্ডে পৌঁছাতে কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
এ ছাড়া ১৮ দশমিক ১ এমপিএ চাপের সময় তিনটি ভালভের মধ্যে প্রথমটি খুলে অতিরিক্ত চাপ নির্গত করার পরীক্ষাও সফল হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনপিসিবিএলের কর্মকর্তারা।
বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানায়, প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ (এমসিআর) ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (ইসিআর) দুই জায়গা থেকেই এসব পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ভালভ খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময়, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্কসংকেত এবং প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রার তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এখন রূপপুরের সামনে বড় মাইলফলক হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরে একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে। এ জন্য বায়রার অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমোদনের পর ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপের মাধ্যমে রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা পর্যায়ক্রমে যাচাই করা হবে।
পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে পূর্ণ নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে প্রাথমিক ক্রিটিক্যালিটিতে নেওয়া হবে। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে।
এরপর প্রকল্পটি ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ সময় রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানো, টারবাইন সিনক্রোনাইজেশন এবং জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এজন্য অপারেটিং অর্গানাইজেশনকে বায়রার কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটকে নিরাপদভাবে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রাথমিকভাবে শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা ৩ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। উৎপাদন শুরুর পরও কয়েক মাস পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিট চালু হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
প্রসঙ্গত, রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।