‎কঠিন সময় পার করছেন ডাক্তাররা  

‎এনামুল কবির রিপন

প্রকাশ: ১৯:৩০, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‎কঠিন সময় পার করছেন ডাক্তাররা  

‎হাসপাতাল মানেই মানুষের কাছে শেষ আশ্রয়। অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে মানুষ ছুটে যান চিকিৎসকের কাছে, সঙ্গে থাকে সুস্থ হয়ে ফিরে আসার প্রত্যাশা। কিন্তু সেই হাসপাতালেই এখন অনেক চিকিৎসকের জন্য তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ। রোগীর মৃত্যু, চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া, দীর্ঘ অপেক্ষা, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা কোনো ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা, হুমকি, অপমান ও মব সৃষ্টির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কোথাও রোগীর স্বজনের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা, কোথাও হাসপাতাল ভাঙচুর, আবার কোথাও চিকিৎসককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো ঘটনাও ঘটছে।

সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি ঘটনাই পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করে। গত ১৬ মে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এক চিকিৎসকের ওপর হামলা এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলায় চিকিৎসক নাসির ইসলাম মাথায় আঘাত পান এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। এ ঘটনায় পরে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১১ জনের নামসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪০ থেকে ৪৫ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।
‎
‎এর আগে ও পরেও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। গত এপ্রিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসকদের মবের হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে।
‎
‎শুধু হাসপাতালের ভেতরের রোগী ও স্বজনকেন্দ্রিক বিরোধই নয়, চিকিৎসকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও এখন আলোচনায় এসেছে। গত আগস্টে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে রাজধানীতে হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে তাঁকে অর্থ দাবির হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
‎
‎চট্টগ্রামেও চিকিৎসকের ওপর হামলার প্রতিবাদে চিকিৎসকেরা মানববন্ধন করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর জাতীয় নীতির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
‎
‎এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। গবেষণাতেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেশের বিভিন্ন স্তরের ১৩টি হাসপাতালে ৬০০ চিকিৎসকের ওপর জরিপ চালানো হয়। তাঁদের ৫৫ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে মৌখিক নির্যাতন ছিল সবচেয়ে বেশি, ৮২ দশমিক ৯ শতাংশ। শারীরিক হামলার কথাও জানিয়েছেন ১৭ দশমিক ১ শতাংশ। এই গবেষণায় রোগীর স্বজনদেরই প্রধান হামলাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ চিকিৎসক। জরুরি বিভাগ, শল্য চিকিৎসা বিভাগ, পালাক্রমে দায়িত্ব পালন এবং চাকরির শুরুর দিকে থাকা চিকিৎসকদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
‎
‎আরেকটি গবেষণায় সরকারি তৃতীয় স্তরের একটি হাসপাতালে ৪৪১ চিকিৎসকের মধ্যে ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের কর্মক্ষেত্রের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে মানসিক চাপ, ভয় দেখানো ও হুমকির ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। শারীরিক সহিংসতার কথাও জানিয়েছেন অনেকে। ওই গবেষণায় রোগীর স্বজনরা ৬৬ শতাংশ ক্ষেত্রে সহিংসতার প্রধান উৎস হিসেবে উঠে এসেছেন। চিকিৎসকেরা সহিংসতার পেছনে চিকিৎসা নিয়ে অসন্তুষ্টি, রোগী ও স্বজনদের অবাস্তব প্রত্যাশা, রোগীর মৃত্যু, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
‎
‎দেশব্যাপী স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর করা আরও বড় একটি গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। ১ হাজার ৮১ জন স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় ৪৩ শতাংশ কর্মী কোনো না কোনো কর্মক্ষেত্রের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ অশারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং ১৬ শতাংশ শারীরিক সহিংসতার কথা জানিয়েছেন। জরুরি বিভাগ ও পালাক্রমে দায়িত্ব পালনকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল। উদ্বেগের বিষয়, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ জানিয়েছেন, ঘটনার পর যথাযথ তদন্ত বা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
‎
‎সমস্যাটি কেবল চিকিৎসকের নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রোগীর নিরাপত্তা এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। একজন চিকিৎসক যদি জরুরি বিভাগে রোগী দেখার সময় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত থাকেন, তাহলে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মনোযোগ এবং মানসিক স্থিরতার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে চিকিৎসক যদি কোনো রোগী বা স্বজনের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কায় কঠিন পরিস্থিতির রোগী দেখাতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত রোগীর ওপরই পড়ে।
‎
‎চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি কঠিন বাস্তবতা সাধারণ মানুষের কাছে সবসময় পরিষ্কার নয়। চিকিৎসা মানেই সুস্থতা নিশ্চিত হওয়া নয়। একই রোগে আক্রান্ত দুই রোগীর ফলাফল এক নাও হতে পারে। অনেক রোগী হাসপাতালে আসেন এমন অবস্থায়, যখন রোগটি ইতিমধ্যে জটিল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের হাতে অনেক সময় খুব অল্প সময় থাকে। তখন চিকিৎসককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার পরও রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।
‎
‎কিন্তু রোগীর স্বজনের কাছে যখন প্রিয় মানুষটি মারা যান, তখন শোক, ভয়, আর্থিক চাপ ও মানসিক বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় অসহায়ত্ব। চিকিৎসক কী করেছেন, কেন করেছেন, কোন পরীক্ষা কেন প্রয়োজন, রোগীর অবস্থা কতটা সংকটাপন্ন কিংবা মৃত্যুর সম্ভাবনা কতটা ছিল, এসব তথ্য যদি পরিবারের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা না হয়, তখন ভুল বোঝাবুঝি দ্রুত সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
‎
‎এখানেই তৈরি হচ্ছে আস্থার সংকট। রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে সম্পর্কটি মূলত বিশ্বাসের। কিন্তু সেই বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না। হাসপাতালের দীর্ঘ অপেক্ষা, চিকিৎসকের স্বল্পতা, রোগীর তুলনায় অতিরিক্ত চাপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিলম্ব, ওষুধের খরচ, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, চিকিৎসার ব্যয় সম্পর্কে অস্পষ্টতা এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগ না থাকলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে। কোনো একটি গুরুতর ঘটনার পর সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হতে পারে।
‎
‎তবে রোগীর ক্ষোভের বাস্তব কারণ থাকলেও হামলা কখনো তার সমাধান হতে পারে না। চিকিৎসায় ভুল হয়েছে কি না, অবহেলা হয়েছে কি না, চিকিৎসক দায়িত্বে গাফিলতি করেছেন কি না, সেটি নির্ধারণ করার জন্য আইনগত ও পেশাগত তদন্তের ব্যবস্থা রয়েছে। রোগীর মৃত্যু বা চিকিৎসার খারাপ ফলাফলকে কেন্দ্র করে আদালতের বাইরে শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি চালু হলে সেখানে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে মবের বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
‎
‎এ ধরনের পরিস্থিতি চিকিৎসকদের মধ্যেও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বিশেষ করে তরুণ চিকিৎসক ও ইন্টার্নদের মধ্যে এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক বছরের কম অভিজ্ঞতার চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। জরুরি বিভাগ ও পালাক্রমে দায়িত্ব পালনকারীরাও বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
‎
‎এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল ৭ দশমিক ২ জন। একই সময়ে নার্স ও মিডওয়াইফের ঘনত্ব ছিল ৬ দশমিক ২ জন।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশসংক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মী প্রোফাইলে ২০২৩ সালে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ মিলিয়ে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে ঘনত্ব ১৩ দশমিক ৯ জন দেখানো হয়েছে। একই প্রতিবেদনে সরকারি স্বাস্থ্যখাতের চিকিৎসকদের ৭৫ শতাংশ শহরাঞ্চলে এবং মাত্র ২৫ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে কাজ করার তথ্যও রয়েছে।
‎
‎অর্থাৎ জনসংখ্যার তুলনায় স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি যেমন আছে, তেমনি তাদের বণ্টনেও বড় বৈষম্য রয়েছে। এই সীমিত জনবলকে যদি নিরাপদ কর্মপরিবেশও দেওয়া না যায়, তাহলে সংকট আরও বাড়বে।
‎
‎চিকিৎসকরা ভুলের ঊর্ধ্বে নন। চিকিৎসকের ভুল হলে তার জবাবদিহি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। রোগীকে অবহেলা করা হলে, ইচ্ছাকৃত অনৈতিক আচরণ হলে কিংবা চিকিৎসা-প্রটোকল ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন ও পেশাগত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু অভিযোগ ওঠা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যেমন অন্যায়, তেমনি চিকিৎসকের ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়াও অন্যায়।
‎
‎তাই প্রয়োজন একটি বিশ্বাসযোগ্য, দ্রুত ও নিরপেক্ষ অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। রোগী বা স্বজন যেন মনে না করেন যে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে কোথাও বিচার পাওয়া যাবে না। একইভাবে চিকিৎসকরাও যেন নিশ্চিত থাকেন যে অভিযোগের নামে তাদের ওপর মব হামলা বা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ কেউ পাবে না।
‎
‎হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকেও এ ক্ষেত্রে বড় দায়িত্ব নিতে হবে। রোগীর স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল থাকতে হবে। গুরুতর রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার ঝুঁকি, সম্ভাব্য ফলাফল ও চিকিৎসার ব্যয় সম্পর্কে যতটা সম্ভব পরিষ্কার তথ্য দিতে হবে। জরুরি বিভাগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী, কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পুলিশি সহায়তা এবং হামলার ঘটনায় বাধ্যতামূলক আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
‎
‎শুধু চিকিৎসক নয়, নার্স, ইন্টার্ন, মেডিকেল কর্মকর্তা, ওয়ার্ডবয়, অ্যাম্বুলেন্সকর্মী এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ হাসপাতালের সেবা একটি দলগত ব্যবস্থা। একজন চিকিৎসককে নিরাপদ রেখে পাশের নার্স বা কর্মীকে অনিরাপদ রাখা হলে পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
‎
‎অন্যদিকে চিকিৎসকদেরও নিজেদের দায়িত্বের জায়গাটি আরও শক্তিশালী করতে হবে। রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে মানবিক আচরণ, রোগীর অবস্থা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা, চিকিৎসার সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো এবং কোনো অভিযোগ উঠলে উত্তেজিত না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা জরুরি। রোগী চিকিৎসকের কাছে শুধু প্রেসক্রিপশন নিতে যান না, তিনি একই সঙ্গে আশ্বাস ও ব্যাখ্যাও চান।
‎
‎একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, হাসপাতাল কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। রোগী ও চিকিৎসক একে অপরের প্রতিপক্ষ নন। একজন চিকিৎসক জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন, আর রোগী ও তাঁর পরিবার সুস্থতার আশায় সেই চিকিৎসকের কাছে আসেন। দুজনের লক্ষ্য একই।
‎
‎কিন্তু পারস্পরিক আস্থা ভেঙে গেলে এই সম্পর্কটি প্রতিপক্ষের সম্পর্কে পরিণত হয়। আর সেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন রোগীই।
‎
‎সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে। একজন তরুণ যখন দেখে চিকিৎসক হওয়ার পর তাকে রাতের দায়িত্ব পালন করতে হবে, জরুরি বিভাগে কাজ করতে হবে, মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর পাশে দাঁড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে রোগীর স্বজনের হামলা বা মবের আশঙ্কাও করতে হবে, তখন তার ক্যারিয়ার পছন্দে প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক নয়। চিকিৎসা শিক্ষা অর্জনে দীর্ঘ সময়, কঠোর পরিশ্রম ও বিপুল মানসিক চাপের পর যদি কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে মেধাবী তরুণদের একটি অংশ ভবিষ্যতে এই পেশা থেকে দূরে সরে যেতে পারেন।
‎
‎এটি শুধু চিকিৎসকদের জন্য ক্ষতি নয়। চিকিৎসক তৈরি হতে সময় লাগে। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরিতে বছরের পর বছর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। তাই একজন চিকিৎসককে কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ রাখা মানে একটি মানবসম্পদকে রক্ষা করা। আর সেই মানবসম্পদ হারানো মানে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করা।
‎
‎বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমনিতেই জনবল, অবকাঠামো, চিকিৎসা ব্যয়, শহর-গ্রাম বৈষম্য এবং সেবার মান নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বাংলাদেশে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২২ সালে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ মিলিয়ে দেশের ঘনত্ব ছিল মাত্র ১৩ জন, যা বৈশ্বিক মধ্যম মানের ৪৯ জনের তুলনায় অনেক কম।
‎
‎এই বাস্তবতায় চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন পেশাগত সমস্যা নয়। এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সমস্যা।
‎
‎তাই এখন প্রয়োজন চিকিৎসক বনাম রোগী নয়, বরং রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে আস্থার সেতু পুনর্নির্মাণ। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়াতে হবে, চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলার অভিযোগ তদন্তের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে, রোগী ও স্বজনদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং একই সঙ্গে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।
‎
‎আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। রোগীর মৃত্যু হলে তদন্ত হবে, চিকিৎসকের ভুল থাকলে ব্যবস্থা হবে, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা থাকলে কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে হবে। কিন্তু কোনো অভিযোগের বিচার হাসপাতালের করিডরে মবের হাতে হতে পারে না।
‎
‎চিকিৎসকের ভুল থাকলে আইন কথা বলুক, কিন্তু রোগীর মৃত্যু হলে প্রতিশোধ নয়, সত্যের অনুসন্ধান হোক। চিকিৎসককে প্রশ্ন করা যাবে, জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে, প্রয়োজনে শাস্তিও দিতে হবে। কিন্তু হামলা, হুমকি, অপমান কিংবা মবের হাতে বিচার কোনো সভ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার পথ হতে পারে না।
‎
‎কারণ আজ যে চিকিৎসককে আমরা নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি, আগামীকাল সেই চিকিৎসকই হয়তো আমাদের সন্তানের চিকিৎসা করবেন। আজ যে তরুণ চিকিৎসক হাসপাতালে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, আগামী দিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাঁর হাতেই তৈরি হবে।
‎
‎তাই চিকিৎসকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু একজন চিকিৎসককে রক্ষা করা নয়। এটি রোগীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর্মীর মর্যাদা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে রক্ষা করার প্রশ্ন। এখনই যদি আস্থার সংকট দূর করা না যায়, হাসপাতালকে নিরাপদ কর্মস্থলে পরিণত করা না যায় এবং চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ককে সংঘাতের বদলে সহযোগিতার জায়গায় ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে এর খেসারত শেষ পর্যন্ত দিতে হবে পুরো সমাজকেই।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন