পুলিশের সামনেই রাড্ডায় লুটপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যকেন্দ্র

সাদ্দাম হোসেন

প্রকাশ: ২০:১২, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:১৮, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুলিশের সামনেই রাড্ডায় লুটপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যকেন্দ্র

‎রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে প্রায় পাঁচ দশক ধরে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে গভীর রাতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। মুখোশধারী শত শত ব্যক্তি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে ব্যাপক লুটপাট চালানোর পর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ কেন্দ্রটির একাধিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়। হামলার পর ঘটনাস্থলে অন্য একটি সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

‎রাড্ডা কর্তৃপক্ষের করা মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে হাতুড়, লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীরা দেয়াল টপকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা নিরাপত্তাকর্মী আন্দ্রিয় সরকার ও আব্দুল হাইকে মারধর করে বেঁধে রাখে। পরে এক্সকাভেটর নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়। আলট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও ল্যাবরেটরি কক্ষের দরজা-জানালা ভেঙে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকাদান সামগ্রী, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
‎
‎ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে লুট হওয়া মালামাল পিকআপে তোলার সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে পুলিশের একটি গাড়ি অবস্থান করার বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সময়ে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপনা ভাঙার ঘটনাও ঘটে। ফলে পুলিশের উপস্থিতি কিংবা ঘটনাটি সম্পর্কে আগে থেকে জানার পরও কেন হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ধ্বংস ঠেকানো গেল না-এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‎
‎ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পুলিশের কোনো অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে পুলিশ ঘটনাটি জানার পর সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল কি না এবং দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
‎
‎এরই মধ্যে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, প্রশাসনিক কারণেই তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে ওসি প্রত্যাহারের সঙ্গে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
‎
‎এ বিষয়ে অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেন মিরপুর জোনের ডিসি। তিনি জানান, কারও নাম ব্যবহার করে পুলিশের কাছে আলাদাভাবে কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে রাড্ডা কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় একটি মামলা করেছে এবং মামলার ভিত্তিতে তদন্ত চলছে।
‎
‎এদিকে রাড্ডা কর্তৃপক্ষের মামলায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে হামলার অভিযোগও উঠে এসেছে। হামলার পর ঘটনাস্থলে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেও জমির মালিকানা ও দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে জমির প্রকৃত মালিকানা এবং হামলার সঙ্গে সমিতিটির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
‎
‎এ বিষয়ে সমিতির বক্তব্য জানতে ঘটনাস্থলে তাদের কার্যালয়ে গেলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে উভয় পক্ষের দাবি এবং দলিলপত্র যাচাই করেই এ বিষয়ে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।
‎
‎ঘটনার পর পুলিশের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ডিএমপির মিরপুর জোনের ডিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে লুট হওয়া মালামালভর্তি দুটি ট্রাক উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং বাকি মালামাল উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
‎
‎ঘটনার একপর্যায়ে ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতিতে একটি স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও পুলিশ নির্বিকার ছিল। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করেন তিনি। তিনি বলেন বিএনপি এমনভাবে চাঁদাবাজি ও লুটপাট করছে যেখানে শিশুদের টীকাও রক্ষা পাচ্ছে না।
‎
‎এর কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান এনসিপির সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া আতঙ্কজনক। ভবনগুলো এমনভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে যে স্বাস্থ্যকর্মীদের বসে কাজ করারও পরিবেশ নেই। এতে এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
‎
‎প্রায় ৫০ বছর ধরে মিরপুরের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুদের টিকাদানসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হামলার পর এসব স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে টিকাদান ও মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
‎
‎সব মিলিয়ে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় এখন সামনে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কারা পরিকল্পনা করে এই হামলা চালিয়েছে, কার নির্দেশে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা ও অফিস সরঞ্জাম কোথায় নেওয়া হয়েছিল, জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে প্রকৃত বিরোধ কী এবং পুলিশের উপস্থিতি সত্ত্বেও কেন এত বড় ঘটনা ঠেকানো গেল না?

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন