তানভীর সৌরভ, খুলনা
প্রকাশ: ১৬:০৯, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৬:১১, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডুমুরিয়া উপজেলার ২ নম্বর রুদাঘরা ইউনিয়নের হাসানপুর গ্রামের ২০ নম্বর হাসানপুর মৌজায় সৈয়দপুর ট্রাস্টের প্রায় ছয় একর জমি রয়েছে। সরকারি নথিতে ওই জমির মালিকানা সৈয়দপুর ট্রাস্টের নামে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে জমিটির একটি অংশ দখল করে সেখানে মাছের ঘের তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পানি নিষ্কাশনের সরকারি খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে আশপাশের মাছের ঘের ও কৃষিজমিতে পানি জমে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, খালটি আগে এলাকার পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খালের বিভিন্ন অংশ দখল করে মাছের ঘের ও বাঁধ তৈরি করায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষার সময় অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে না পারায় নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে কৃষিজমির ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মাছের ঘেরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় পানি বসতবাড়ির আশপাশে উঠে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হয় বলে জানান স্থানীয়রা।
এই অভিযোগের সঙ্গে ডুমুরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা তৌবিব জোয়ারদারের নাম উঠে এসেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি নামে রেকর্ড করিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দখলে রাখা হয়েছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে একাধিকবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি নামে রেকর্ড করিয়ে দখলে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তৌবিব জোয়ারদার। তিনি বলেন, জমিটি দীর্ঘদিন ধরে তাদের দখলে রয়েছে। তার দাবি, তৎকালীন খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন সরেজমিনে ওই জমি পরিদর্শন করে তাকে দখল বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তবে ওই দাবির পক্ষে কোনো সরকারি আদেশ, দখল হস্তান্তরের নথি বা লিখিত অনুমোদন দেখানো হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হাসানপুরের এই জমি ও খাল নিয়ে বিরোধের বিষয়টি নতুন নয়। ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে খুলনা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। ওই অভিযোগের পর তৎকালীন খুলনার রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর আতিকুল ইসলাম বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেন। পরে ৩০ আগস্ট ২০১৫ সৈয়দপুর ট্রাস্টের আইনজীবী এম এ আউয়াল রাজকে ট্রাস্টের জমির রেকর্ড পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে উপযুক্ত আদালতে মামলা করার লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই নির্দেশ দেওয়ার পর তারা আশা করেছিলেন সরকারি সম্পত্তির রেকর্ড ও দখলসংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। একই সঙ্গে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে এনে জলাবদ্ধতার সমস্যারও সমাধান হবে। কিন্তু অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সেই নির্দেশের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও সরকারি পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো মামলা বা জমি উদ্ধারের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
২০১৫ সালের পরও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ২০২৩ সালে আবারও সংগঠিত হন এলাকাবাসী। ওই সময় জলাবদ্ধতা ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয় তুলে ধরে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের কাছে গণস্বাক্ষরসহ অভিযোগ দেন তারা। অভিযোগে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের পথ সচল করার দাবি জানানো হয়। কিন্তু এরপরও কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় একই বছরের ১৯ অক্টোবর খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেন গ্রামবাসী।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩ খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী কমিশনার এস এম মুস্তাফিজুর রহমান জেলা প্রশাসককে ২০ নম্বর হাসানপুর মৌজায় সৈয়দপুর ট্রাস্টের সম্পত্তি উদ্ধার ও রেকর্ড সংশোধনের জন্য লিখিতভাবে অনুরোধ করেন। এলাকাবাসীর দাবি, বিভাগীয় পর্যায় থেকে এ ধরনের লিখিত নির্দেশনার পরও জমি উদ্ধার কিংবা খালের পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তৌবিব জোয়ারদার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। তাদের দাবি, কথিত সরকারি খালটিতে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ একাধিকবার গিয়েছেন এবং সেখানে মাছ শিকারসহ দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। এ সংক্রান্ত কিছু ছবিও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা। তবে এসব ছবির সত্যতা, সময়কাল এবং জমি দখল বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে প্রশাসনিক পর্যায়ে একাধিকবার উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে একই পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন আশায় আবারও প্রশাসনের দ্বারস্থ হন হাসানপুরের বাসিন্দারা। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই পুরোনো অভিযোগ, নথিপত্র ও গণস্বাক্ষর সংযুক্ত করে খুলনা জেলা প্রশাসকের কাছে নতুন করে লিখিত অভিযোগ দেন গ্রামবাসী।
নতুন করে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত ও রেকর্ড সংশোধনের জন্য ডুমুরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি অমিত কুমার বিশ্বাসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এই উদ্যোগে দীর্ঘদিনের বিরোধের নিষ্পত্তি এবং সরকারি সম্পত্তির প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার আশা করছেন স্থানীয়রা।
ডুমুরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি অমিত কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এর আগেও একটি ট্রাস্টের সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়েছে। হাসানপুরের অভিযোগের বিষয়েও কাজ শুরু হয়েছে। সরকারি জমি ব্যক্তি নামে রেকর্ড করে দখলে রাখার কোনো সুযোগ নেই। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি সম্পত্তি হলে তা পুনরুদ্ধার করা হবে।
এদিকে তৌবিব জোয়ারদারের বক্তব্যে তৎকালীন খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেনের নাম আসায় বিষয়টি নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। মোহাম্মদ হেলাল হোসেন পরবর্তীতে ওএসডি ছিলেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ৩২ জন যুগ্ম সচিবের মধ্যে তার নামও ছিল। তবে তার চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে হাসানপুরের জমির মালিকানা বা দখল নিয়ে ওঠা অভিযোগের সরাসরি কোনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জমি ও খালের বিরোধের কারণে শুধু সরকারি সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়নি, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবিকা ও পরিবেশের ওপর। হাসানপুরের অনেক পরিবার কৃষিকাজ ও মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় তাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অতিরিক্ত পানি জমে থাকায় অনেক সময় মাছের ঘের ও কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে। ফলে প্রতিবছরই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে খালটি দখলমুক্ত করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। তাদের মতে, জমির মালিকানা নিয়ে যে বিরোধই থাকুক না কেন, এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখা জরুরি। কারণ জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এমন মানুষও রয়েছেন, যারা জমি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন।
হাসানপুরের এই ঘটনা নিয়ে এখন মূলত সরকারি নথি ও প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছেন স্থানীয়রা। জমিটির প্রকৃত মালিকানা, রেকর্ডের ইতিহাস, বর্তমান দখল, খালের অবস্থান এবং পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে এর সম্পর্ক তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা। পাশাপাশি অতীতে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য দেওয়া নির্দেশনা কেন বাস্তবায়িত হয়নি, সেটিও তদন্তের আওতায় আসবে কি না, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে এলাকাবাসীর।
ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে সরকারি খতিয়ান, দাগ নম্বর, দলিল, রেকর্ড সংশোধনের নথি, সরকারি আদেশ এবং প্রয়োজনে আদালতের নথিই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে হাসানপুরের জমি নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত অবস্থাও এসব নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে খালের প্রকৃত অবস্থান ও পানি প্রবাহের পরিস্থিতি যাচাই করা হলে জলাবদ্ধতার কারণও আরও পরিষ্কার হতে পারে।
এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি সম্পত্তি দখলের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী তা উদ্ধারের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অতীতে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দেওয়া অভিযোগ ও নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো ধরনের গাফিলতি বা অনিয়ম হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা অভিযোগ, একাধিক সরকারি দপ্তরে আবেদন, গণস্বাক্ষর এবং সরকারি পর্যায়ে দেওয়া লিখিত নির্দেশনার পর হাসানপুরের এই জমি ও খাল নিয়ে বিরোধ এখন নতুন করে প্রশাসনের নজরে এসেছে। চলমান তদন্তে সৈয়দপুর ট্রাস্টের জমির প্রকৃত মালিকানা ও রেকর্ডের অবস্থান কী উঠে আসে এবং সরকারি সম্পত্তি হলে তা উদ্ধারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
হাসানপুরবাসীর প্রত্যাশা, এবার যেন আগের মতো অভিযোগ ও সরকারি চিঠিপত্রের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ না থাকে। তদন্তের মাধ্যমে জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যারও স্থায়ী সমাধান হবে। জেলা প্রশাসনের চলমান তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই এখন নির্ভর করছে হাসানপুরের দুই শতাধিক পরিবারের দীর্ঘদিনের এই সমস্যার ভবিষ্যৎ।
শীর্ষ সংবাদ: