বিজিবির গোপন তথ্য ইয়াবাকারবারীদের কাছে ফাঁস করেন এমপি শাহাজাহান

খান মাইনুদ্দিন, কক্সবাজার

প্রকাশ: ১৬:২৫, ৫ অক্টোবর ২০২৬

বিজিবির গোপন তথ্য ইয়াবাকারবারীদের কাছে ফাঁস করেন এমপি শাহাজাহান

‎কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালানকে ঘিরে নতুন করে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বিজিবির একটি ক্যাম্প পরিদর্শনের পর বাহিনীর তৎপরতা ও অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মাদক কারবারিদের কাছে পৌঁছে যায়। এর পরদিনই বিজিবির ওপর সশস্ত্র হামলা এবং জব্দ করা বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়।

ঘটনাটি ঘটে ২৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে। এর আগের দিন ২২ সেপ্টেম্বর এমপি শাহজাহান চৌধুরী একটি বিজিবি ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্প পরিদর্শনের পরদিন রাতেই তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত লেডাইয়া গ্রুপের সদস্যরা বিজিবির ওপর গুলি চালায় । একই সময়ে উখিয়ার আলোচিত মাদক কারবারি আবুল ফয়েজ ওরফে গুটি ফয়েজের কাছ থেকে জব্দ করা প্রায় ১৪ লাখ ইয়াবা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিজিবির সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে ইয়াবা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এরপর গুটি ফয়েজ আত্মগোপনে চলে যায় বলেও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে বিজিবির অভিযানের তথ্য মাদক কারবারিদের কাছে কীভাবে পৌঁছাল, তা নিয়ে। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা একটি চক্র সীমান্তে বিজিবির গতিবিধি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে। সেই তথ্য ব্যবহার করেই অভিযানের সময় ও অবস্থান সম্পর্কে মাদক কারবারিরা প্রস্তুতি নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বিজিবির গোপন তথ্য সরাসরি এমপি শাহজাহান চৌধুরী ফাঁস করেছেন, এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে । ফলে অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত প্রয়োজন। গত দেড় বছরে কক্সবাজার ও সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে শাহজাহান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অন্তত দেড় শতাধিক ব্যক্তি ইয়াবাসহ আটক বা গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। তাঁদের সঙ্গে এমপির সম্পর্কের ধরন এবং মাদক কারবারে তাঁদের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে। শুধু এমপিকে ঘিরেই নয়, তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ছেলে রাজীব চৌধুরী, মেয়ে নাজিয়া চৌধুরী এবং ভাই সরোয়ার চৌধুরীর বিরুদ্ধে মাদক কারবারে সম্পৃক্ততা, দখলবাণিজ্য এবং মাদক মামলায় আসামিদের ছাড়িয়ে নিতে তদবির করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত এলাকার জমি দখল, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং মিয়ানমার থেকে আসা বিভিন্ন চোরাচালানের রুট নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এই চক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিজিবির ওপর হামলার অভিযোগটি অবশ্যই আলাদাভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে জব্দ করা ১৪ লাখ ইয়াবা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করাও জরুরি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পরও প্রভাবশালী মহলের কারণে অনেক সময় তারা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে এমপি শাহজাহান চৌধুরী, তাঁর ছেলে রাজীব চৌধুরী, মেয়ে নাজিয়া চৌধুরী ও ভাই সরোয়ার চৌধুরীর বক্তব্য জানা যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। বিজিবির তথ্য ফাঁসের অভিযোগ, ২৩ সেপ্টেম্বরের হামলা এবং ১৪ লাখ ইয়াবা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পাশাপাশি মাদক কারবারিদের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগের অভিযোগও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন