সাদ্দাম হোসেন
প্রকাশ: ১৭:০৪, ১০ অক্টোবর ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা-মর্তুজাবাদ এলাকার বাসিন্দা সেলিম প্রধান জাপান-বাংলাদেশ গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত। তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা মতাদর্শের কারণে যেন তাঁকে হয়রানির শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
পরিবারের দেওয়া মামলার তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, সেলিম প্রধানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিস্ফোরক-সংক্রান্ত আইন এবং অন্যান্য ধারায় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর গুলশানের বারিধারার একটি রেস্তোরাঁ থেকে সেলিম প্রধানসহ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। ওই ঘটনায় গুলশান থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। পরে ২০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ওই মামলায় আদালত তাঁকে জামিন দেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এরপর ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল তারিখে দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায়, যার নম্বর ২৫(৪)২৫, ২১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় বলে সরবরাহ করা নথিতে উল্লেখ রয়েছে। মামলাটির থানা/ইউনিট হিসেবে গুলশান গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) উল্লেখ করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, এ মামলায় তাঁর জামিনের তারিখ ২১ মে ২০২৬।
এর আগে ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আরেকটি মামলায়, যার নম্বর ১৭(১২)২৪, ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর তথ্য রয়েছে। এ মামলাটিও গুলশান থানার অধীন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটিতে জামিনের তারিখ হিসেবে ২১ মে ২০২৬ উল্লেখ রয়েছে।
একইভাবে, ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দায়ের করা বিস্ফোরক-সংক্রান্ত একটি মামলায়, যার নম্বর ৩২(২)২৫, ৬ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে। গুলশান থানার এ মামলায় জামিনের তারিখ হিসেবে ৫ জুলাই ২০২৬ উল্লেখ রয়েছে।
পরিবারের দেওয়া তালিকায় আরও একটি মামলার তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ৮ আগস্ট দায়ের করা বিস্ফোরক-সংক্রান্ত আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের ধারাসহ উল্লেখিত মামলাটির নম্বর ১৭/৩০০৫। এতে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর তারিখ হিসেবে ৮ জুলাই ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই গুলশান থানার একটি হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে পরিবারের বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর নতুন বাজারের বাঁশতলা এলাকায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় তৌহিদ মিয়া আহত হন। এ ঘটনায় করা মামলায় সেলিম প্রধানসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। শুনানিতে তাঁর আইনজীবীরা গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের বিরোধিতা করেন; তবে আদালত আবেদন না মঞ্জুর করেন বলে তার পরিবার জানায়।
সেলিম প্রধানের পরিবারের অভিযোগ, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে হয়রানি করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণকারী বা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে একমত না হওয়া ব্যক্তিদের বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর প্রবণতা ছিল। সেলিম প্রধানও সেই ধরনের রাজনৈতিক চাপের শিকার হয়েছেন বলে মনে করে তাঁর পরিবার।
পরিবারের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তাঁর আইনি জটিলতার অবসান হয়নি। বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ও কারাবাসের কারণে তাঁর ব্যক্তিজীবন এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অবসান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। সেই প্রত্যাশার আলোকে সেলিম প্রধানের পরিবারের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করা হোক এবং আইন অনুযায়ী তাঁর অধিকার নিশ্চিত করা হোক।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, তাঁরা কোনো বিশেষ সুবিধা বা আইনের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত চান না। তাঁরা চান, প্রতিটি মামলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক, আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হোক এবং আদালতের স্বাধীন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।
তাঁদের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেবে। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা অতীতের অবস্থান-কোনোটিই যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা না হয়, সেটিই এখন সেলিম প্রধানের পরিবারের প্রধান দাবি।