‎বরিশালে ঘুষের টাকায় কোটিপতি দূর্নীতিবাজ শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন

‎রফিকুল ইসলাম, বরিশাল

প্রকাশ: ২২:৫৮, ১০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২৩:০০, ১০ অক্টোবর ২০২৬

‎বরিশালে ঘুষের টাকায় কোটিপতি দূর্নীতিবাজ শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন

‎শিক্ষকদের বদলি, ডেপুটেশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার ফাইল নিষ্পত্তিতে ঘুষ দাবি এবং হয়রানির অভিযোগ উঠেছে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, অর্থ না দিলে অনেক ক্ষেত্রে ফাইল আটকে রাখা হয়; প্রতিবাদ করলে দেওয়া হয় কারণ দর্শানোর নোটিশ। এমনকি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক শিক্ষিকার মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রেও ৩০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে ভুক্তভোগীরা৷ শুধু তাই নয়, অভিযোগের বিবরণীতে উঠে এসেছে: বর্তমানে বরিশালে বাকেরগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসের দায়িত্বে থাকা দূর্নীতিবাজ শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেয়া তার স্ত্রী ও ছোটভাই নুরুলকে দিয়ে শিক্ষকদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করান। 

আর এভাবেই ‎শিক্ষকদের হয়রানি করে কুয়াকাটার হোটেল জননীসহ বরিশালে গড়েছেন অঢেল অবৈধ সম্পদের পাহাড়। এসব অবৈধ সম্পদের তথ্য দীর্ঘদিন ধামাচাপা দিয়ে রাখলেও অবশেষে বেরিয়েছে থলের বিড়াল।
‎
‎দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের মাল্টিমিডিয়ায় প্রকাশিত ধারাবাহিক অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে রুহুল আমিনের কথিত বিপুল সম্পদ ও আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এবার সামনে আসছে তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষক হয়রানি, বদলি ও ডেপুটেশন বাণিজ্য এবং বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দের অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ। 
‎
‎ভুক্তভোগী শিক্ষকদের ভাষ্য, মাতৃত্বকালীন ছুটি, বদলি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা উত্তোলন, পেনশন এবং ব্যাংকঋণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে তাঁদের নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন ছাড়া প্রয়োজনীয় ফাইল এগোয় না। প্রতিবাদ করলে চাকরিসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি করা কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
‎
‎এক শিক্ষিকার অভিযোগ, ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য তাঁর কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে কারণ দর্শানোর নোটিশের মুখে পড়ে তিনি বাধ্য হয়ে চড়া সুদে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ঋণ নেন। এরপর ওই টাকা দিয়ে ছুটি নিতে হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। একজন শিক্ষকের প্রাপ্য ছুটি পেতে এমন আর্থিক চাপের মুখে পড়ার ঘটনা সত্য হলে তা সরকারি সেবা প্রদানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
‎
‎শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেপুটেশন বা সাময়িক সংযুক্তি পেতে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগের তালিকায় সাতানিয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলীম ইবনাতকে পৌরসভা বিদ্যালয়ে, শাকবুনিয়ার জাকারিয়াকে লক্ষ্মীপাশা আমিনিয়া বিদ্যালয়ে, গারুড়িয়ার শারমিন আক্তারকে দেউলি বিদ্যালয়ে, মতিউর রহমান বিদ্যালয়ের শিবশংকর দাসকে খেজুরা ভরপাশা বিদ্যালয়ে এবং পোড়াচিপার আমিনুল ইসলামকে দক্ষিণ দাওকাঠি বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
‎
‎এ ছাড়া জান্নাতুন ফেরদৌসি, লাইজু আক্তার, ইতি আক্তার, সাথী আক্তার, সোনিয়া আক্তার, জামিল আক্তার, আনিকা ইবনাত, কাকলী দে ও নাসরিন সুলতানাসহ আরও কয়েকজন শিক্ষককে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। 
‎
‎শুধু বদলি ও ডেপুটেশন নয়, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের দাবি, বিদ্যালয় পর্যায়ের স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা কেটে রাখার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি তিন-চার বছর আগের ফাইল পুনরায় সামনে এনে বিভিন্ন ভুলত্রুটি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষকদের চাপে রাখার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বরাদ্দের নথি, হিসাব বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।
‎
‎অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় কয়েকজন ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাঁদের অভিযোগে সাবেক শিক্ষক সেলিম, সহকারী শিক্ষক সালেহীন শিকদার এবং প্রধান শিক্ষক পরশের নাম এসেছে। 
‎
‎বাকেরগঞ্জের কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, তাঁরা এসব অভিযোগ নিয়ে দুদক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করা হোক এবং কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর কারণে কোনো শিক্ষক যেন প্রশাসনিক হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
‎
‎সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়া নয়; শিক্ষকদের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম তদারক করা এবং সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। ফলে এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবি, অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
‎
 উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের কাছে মোঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি এবিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। ।
‎
‎বাকেরগঞ্জের শিক্ষকদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ তদন্ত করবে। একই সঙ্গে বদলি, ডেপুটেশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন ও বিদ্যালয়ের বরাদ্দসংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে, যাতে শিক্ষকরা হয়রানি ছাড়াই তাঁদের ন্যায্য সেবা পান। দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের ধারাবাহিক অনুসন্ধানের পরবর্তী পর্বে এ বিষয়ে আরও তথ্য, নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন