সিলেটে লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ছড়াছড়ি

ফয়জুল হক শিমুল, সিলেট : 

প্রকাশ: ০৯:২৬, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিলেটে লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ছড়াছড়ি

সিলেটে একের পর এক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। কোথাও বৈধ লাইসেন্স নেই, কোথাও বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযান ও জরিমানার পরও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না এসব অনিয়ম।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্য বলছে, নগরী থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে লাইসেন্স ও অনুমোদনের বিষয়টি নিয়ে নিয়মিত তদারকি না থাকায় কিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নিয়মের বাইরে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি সিলেট জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের যৌথ অভিযানে নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অনিয়ম ধরা পড়ে। অভিযানে মহানগর হাসপাতালের বৈধ লাইসেন্স না থাকা ও স্বাস্থ্যসেবার মানসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই অভিযানে ল্যাব ডেল্টা ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।

এর আগে নগরীতে পরিচালিত আরেক অভিযানে লাইসেন্স নবায়ন না করা এবং অন্যান্য অনিয়মের কারণে দুটি বেসরকারি হাসপাতালকে জরিমানা করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

পুরোনো তালিকায় ৩৯ অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান

স্বাস্থ্য বিভাগের ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় সিলেট নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩৯টি অনিবন্ধিত ক্লিনিক, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডেন্টাল ক্লিনিকের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে নগরীতে ১৬টি এবং বিভিন্ন উপজেলায় ২৩টি প্রতিষ্ঠান ছিল।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা জানতে নতুন করে হালনাগাদ তালিকা প্রয়োজন। কারণ  তদারকির অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নবায়ন করছে না বা নির্দেশনা মানছে না। 

রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষার রিপোর্ট রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেখানে দক্ষ টেকনোলজিস্ট, মানসম্মত যন্ত্রপাতি ও যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ভুল রিপোর্টের আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব পড়তে পারে রোগীর চিকিৎসার ওপর।

অন্যদিকে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো যথাযথ না থাকলে রোগীর জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ অনেক রোগী কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা অনুমোদনের বিষয়টি যাচাই না করেই চিকিৎসা নিতে যান। ফলে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও সেবার মান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। 

অভিযান কেন স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না?

সিলেটে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, জরিমানা এবং সতর্ক করার ঘটনা ঘটলেও অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না এমন অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, জরিমানা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা পরবর্তীতে কতটা কার্যকরভাবে তদারকি করা হচ্ছে?

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান নয় লাইসেন্সের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ, অনুমোদনবিহীন প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা, পুনরায় পরিদর্শন এবং গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

সিলেটের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। লাইসেন্স, জনবল, অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবার মানসহ বিভিন্ন বিষয় পরিদর্শন করা হচ্ছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন কোন কোন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে এবং কোনগুলো লাইসেন্সবিহীন এমন একটি হালনাগাদ তালিকা কি জনসম্মুখে প্রকাশ করা হউক?

কারণ চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে একজন রোগী যেন অন্তত এটুকু নিশ্চিত হতে পারেন তিনি যে প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন, সেটি বৈধ অনুমোদনপ্রাপ্ত কি না এবং সেখানে চিকিৎসা নেওয়া নিরাপদ কি না।

সিলেটে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়িয়েছে। তবে এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, চিকিৎসাসেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। নিয়মিত নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অভিযান ও জরিমানার পরও অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।

আরও পড়ুন