সাদ্দাম হোসেন
প্রকাশ: ১৫:৪৫, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোকে ঘিরে পরিবেশ উন্নয়ন, নদীতীর সংরক্ষণ ও নৌপরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সংস্থাটির উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. শাহাদাত হোসেন দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, ঢাকার চারপাশের নদীবন্দর এলাকায় ইতোমধ্যে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, এক কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, একটি জেটি এবং ৫০ মিটার কোয়ে ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নদীতীরজুড়ে সবুজায়নের অংশ হিসেবে পাঁচ হাজার গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর উন্নয়ন কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের জমি সংরক্ষণ, অবৈধ দখল প্রতিরোধ এবং নদীবন্দর এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন। এ লক্ষ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের আওতায় সীমানা খুঁটি স্থাপন, ওয়াকওয়ে, নদীতীর সংরক্ষণ, জেটি ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো নগরায়ণের চাপ, দূষণ ও তীর দখলের সমস্যায় জর্জরিত। তাই নদীর জমি উদ্ধার করার পাশাপাশি তা সংরক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানুষের জন্য পরিকল্পিত জনপরিসর তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াকওয়ে, তীররক্ষা অবকাঠামো ও বৃক্ষরোপণ বাস্তবায়িত হলে নদীতীরের পরিবেশ উন্নয়ন এবং নগরবাসীর হাঁটাচলা ও অবসর কাটানোর সুযোগ বাড়তে পারে।
বিআইডব্লিউটিএর দেওয়া তথ্যমতে, নদীবন্দর এলাকায় নির্মিত ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নদীর তীর ঘেঁষে মানুষের চলাচল ও নদীর পরিবেশ উপভোগের সুযোগ তৈরি করছে। এ ছাড়া এক কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, একটি জেটি ও ৫০ মিটার কোয়ে ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবকাঠামো নদীতীরের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং নৌপরিবহনের সুবিধা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সংস্থাটির প্রকল্প-সংক্রান্ত দরপত্রেও ঢাকার ও টঙ্গীর নদীবন্দর এলাকায় ওয়াকওয়ে, কোয়ে ওয়াল, নদীতীর সংরক্ষণ, জেটি, সড়ক ও পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণের কাজের উল্লেখ রয়েছে। ফতুল্লা থেকে ধর্মগঞ্জ, পাগাড় থেকে হারবাইদ এবং আশুলিয়া থেকে কামারপাড়া এলাকায় এসব অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দরপত্র প্রকাশ করা হয়। দরপত্রে সম্ভাব্য বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে।
নদীতীরের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকার চারপাশে পাঁচ হাজার গাছ লাগানোর উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন মো. শাহাদাত হোসেন। পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ নদীতীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, ছায়া সৃষ্টি এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। তবে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর পরিচর্যা ও টিকে থাকা নিশ্চিত করাও জরুরি।
নদীতীরভিত্তিক পরিবেশ উন্নয়নের একটি উদাহরণ বুড়িগঙ্গা ইকোপার্ক। রাজধানীর শ্যামপুর এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত এ পার্কটি শ্যামপুর ইকোপার্ক বা বিআইডব্লিউটিএ ইকোপার্ক নামেও পরিচিত। ২০১২ সালের অক্টোবরে নদী দখল প্রতিরোধ ও পরিবেশ উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে পার্কটি নির্মাণ করা হয়। এর আয়তন প্রায় সাত একর বলে বিভিন্ন তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
পার্কটিতে হাঁটার পথ, বসার স্থান, গাছপালা ও নদীর দৃশ্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও অবসর কাটানোর স্থান হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ দর্শনার্থীর সমাগম হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পার্ক ও ওয়াকওয়ের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, প্রবেশাধিকার, বৃক্ষ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুন নির্মিত নদীতীরের স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রেও কার্যকর ব্যবস্থাপনা জরুরি।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে ঘিরে ওয়াকওয়ে ও ইকোপার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) প্রকাশিত প্রকল্প-তথ্যে ঢাকার চারপাশের প্রায় ১১০ কিলোমিটার বৃত্তাকার নৌপথকে কেন্দ্র করে তৃতীয় পর্যায়ের ওয়াকওয়ে, ইকোপার্ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের কাজের উল্লেখ রয়েছে।
সমীক্ষায় বিদ্যমান ভূমি, কোয়ে ওয়াল ও খুঁটির ওপর উঁচু করে মোট ৯১ দশমিক ৪৭৬ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচটি ইকোপার্ক, সাতটি জেটি, ১৩টি ল্যান্ডিং স্টেশন, ৫০টি সিঁড়ি এবং ৪৪ দশমিক ৫৮৫ কিলোমিটার এলাকায় জলজ উদ্ভিদ রোপণের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে নদীতীরের বিভিন্ন অংশকে সংযুক্ত করে হাঁটাচলা, বিনোদন ও নৌপরিবহন অবকাঠামোর সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন, জমির সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল প্রতিরোধ, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
বিআইডব্লিউটিএর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে ১১৪ কিলোমিটার নৌপথ যুক্ত হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, বর্ষা মৌসুমে দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ হাজার ১৪২ কিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার ৭৪২ কিলোমিটার। এ ছাড়া ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত খননের মাধ্যমে ৬০ কিলোমিটার নৌপথ যুক্ত হওয়ার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।
ঢাকার চারপাশের নদীতীরে ওয়াকওয়ে, জেটি, তীররক্ষা অবকাঠামো ও বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নগরবাসীর জন্য পরিবেশবান্ধব জনপরিসর তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নির্মিত অবকাঠামোর ব্যবহারযোগ্যতা, গাছের টিকে থাকা, নদীতীর দখলমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। পরিকল্পনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নদী ও নগরের মধ্যে পরিবেশবান্ধব সংযোগ গড়ে তোলার সুযোগ আরও বাড়বে।