সেপ্টেম্বরে ১৪৮ মৃত্যু: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কোথায় ঘাটতি?

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা

প্রকাশ: ১৮:০৭, ১ অক্টোবর ২০২৬

সেপ্টেম্বরে ১৪৮ মৃত্যু: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কোথায় ঘাটতি?

বাংলাদেশে আবারও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু। বছরের শুরুতে পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্ষা পেরিয়ে সেপ্টেম্বরে এসে হঠাৎ বেড়েছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৪৮ জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪৫ জনে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৬২০ জন।

৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৯৪৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন আরও ছয়জন। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শেষ দিনেও পরিস্থিতির কোনো স্বস্তির সংকেত মেলেনি।

প্রশ্ন উঠছে—ডেঙ্গুর মৌসুম সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্কতা থাকার পরও কেন সেপ্টেম্বরেই পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হলো? মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম কি বাস্তব ঝুঁকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে?

এক মাসে ১৪৮ মৃত্যু কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু বর্ষার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সেপ্টেম্বরে এসে এক মাসেই ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে—যা এ বছরের একক মাসে সর্বোচ্চ।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অক্টোবরেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে ব্যবহৃত একটি পূর্বাভাস মডেলও অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখিয়েছে।

অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহতা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; অক্টোবরেও সংক্রমণের চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে বড় প্রশ্ন

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞ মতামতে উঠে এসেছে, শুধু মশার ওষুধ ছিটানো বা ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১১ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর পরও ডেঙ্গুর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যায়নি। বিশেষজ্ঞরা দুর্বল নজরদারি, পর্যাপ্ত কীটতত্ত্ববিদের ঘাটতি এবং মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংসে দুর্বলতাকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এখানেই উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মশা মারার কার্যক্রম কতটা নিয়মিত হচ্ছে, আর কোথায় এডিসের লার্ভা তৈরি হচ্ছে সেটি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কতটা কার্যকরভাবে?

ঢাকার বাইরে ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু

ডেঙ্গুকে দীর্ঘদিন মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও বর্তমান চিত্র ভিন্ন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বরের আগের ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ বিভাগে ১০২ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চট্টগ্রামে ৩৪৩, খুলনায় ২৪৮, বরিশালে ২১২ এবং রাজশাহীতে ২১১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬১ হাজারের বেশি মানুষ। বিপরীতে দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ভর্তি হয়েছেন প্রায় ১৮ হাজার রোগী।

এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীর সমস্যা নয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও নজরদারি এবং মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

হাসপাতালেও বাড়ছে চাপ

ডেঙ্গুর সঙ্গে একই সময়ে দেশে অন্যান্য সংক্রামক রোগের চাপও রয়েছে। ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান চাপের পাশাপাশি বাংলাদেশ আরেকটি বড় সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের চাপও সামলাচ্ছে।

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে শুধু হাসপাতালের শয্যা নয়—চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

তাহলে করণীয় কী?

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে—
প্রথমত, শুধু ফগিং নয়, নিয়মিত লার্ভা জরিপ করে প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এডিস মশার নজরদারি বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্রসহ সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
চতুর্থত, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, নাগরিকদের সম্পৃক্ত না করে শুধু সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণে মানুষকে নিয়মিত সম্পৃক্ত করতে হবে।
অক্টোবরই হতে পারে বড় পরীক্ষা

সেপ্টেম্বরে ১৪৮ মৃত্যুর পর অক্টোবর শুরু হয়েছে আরও বড় উদ্বেগ নিয়ে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল থাকলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

তাই এখন মূল প্রশ্ন শুধু “কতজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেন” নয়। বরং প্রশ্ন হলো—আগে থেকেই জানা ঝুঁকির মধ্যে মশার প্রজননস্থল কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাড়তি চাপ সামলানোর জন্য কতটা প্রস্তুত?

সেপ্টেম্বরের ১৪৮ মৃত্যু সেই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। অক্টোবরের শুরুতেই কার্যকর পদক্ষেপ জোরদার করা গেলে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন